লোহাগাড়া পল্লী বিদ্যুৎ অফিস সিন্ডিকেটের জিম্মি, গ্রাহকরা বিপাকে
লোহাগাড়া পল্লী বিদ্যুৎ অফিস সিন্ডিকেটের জিম্মি, গ্রাহক বিপাকে

লোহাগাড়া পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে দুর্নীতির সিন্ডিকেট

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল কার্যালয়টি দুর্নীতি-অনিয়মের আতুঁড়ঘরে পরিণত হয়েছে। গ্রাহক হয়রানি চরমে পৌঁছেছে। টাকা ছাড়া এখানে কোনো ফাইল নড়ে না। কার্যালয়টির এক উপ-মহাব্যবস্থাপকের নেতৃত্বে দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট গ্রাহকদের জিম্মি করে রেখেছে। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত আয়ে ভিলেজ ইলেকট্রিশিয়ানরা বিলাসবহুল বাড়ি গড়ে তুলেছেন।

গ্রাহক হয়রানি ও দুদকে অভিযোগ

এই সিন্ডিকেটের অনিয়ম-দুর্নীতি ও গ্রাহক হয়রানিতে অতিষ্ঠ হয়ে লোহাগাড়া উপজেলার বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন খান দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। পাশাপাশি সিন্ডিকেটের বিভিন্ন স্থাপনার ছবিও দুদকে জমা দেওয়া হয়েছে। দুদক বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গেছে।

একাধিক ভুক্তভোগী জানান, পল্লী বিদ্যুতের লোহাগাড়া জোনাল অফিসের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহক হয়রানি চলছে। কোনো গ্রাহক সমস্যায় পড়ে অফিসে গেলে তাকে সিন্ডিকেট সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়। তারা নানা সমস্যার কথা বলে গ্রাহককে ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে মামলা, সংযোগ বিচ্ছিন্ন, জরিমানাসহ নানা ভয় দেখানো হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নতুন সংযোগে অনিয়ম

নতুন সংযোগের আবেদন অফলাইন ও অনলাইনে নেওয়া হলেও সহজে ফাইল রিসিভ করা হয় না। নানা অজুহাতে গ্রাহকদের ঘোরানো হয়। অফলাইন ও অনলাইনে টাকা জমা নেওয়া হলেও বলে দেওয়া হয় লাইন নির্মাণের তার, ট্রান্সফরমার, মিটার নেই। শত শত সিএমও (কনজুমার মিটার অর্ডার) গ্রাহককে মাসের পর মাস ঘোরানো হয়। তবে দালালদের কাছে গেলে এবং চাহিদামতো টাকা দিলে সব সমস্যা মুহূর্তে সমাধান হয়। অভিনব কৌশলে একজন গ্রাহকের নামে একাধিক মিটার নিয়ে উচ্চ মূল্যে বিক্রি করা হয়েছে ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তদন্ত কমিটি গঠন

সম্প্রতি একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেন চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর জিএম প্রকৌশলী দীলিপ চন্দ্র চৌধুরী। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয় সাতকানিয়া উপজেলা জোনাল অফিসের ডিজিএম মো. মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীকে। সদস্য হিসেবে রাখা হয় এজিএম (ইএন্ডসি) মো. আজহারুল ইসলাম আবিরকে। তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলেও অনিয়মে জড়িত কোনো কর্মকর্তা ও দালাল চক্রের শাস্তি হয়নি।

ডিজিএম রফিকুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ

লোহাগাড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জোনাল অফিসের ডিজিএম রফিকুল ইসলাম খান, জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হাবিবুর রহমান, ভিলেজ ইলেকট্রিশিয়ান মো. সেলিম ও মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। তারা নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে পল্লী বিদ্যুতের টাকা লুটপাটে ব্যস্ত। বাণিজ্যিক সংযোগ থেকেও লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নতুন সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতি খাম্বা বাবদ নির্দিষ্ট অংকের টাকা হাতিয়ে নেয় এই চক্রটি।

গুরুতর অনিয়মের উদাহরণ

লোহাগাড়া জোনাল অফিসের চুনতি এলাকায় গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর আমিনুর রহমান নামে এক গ্রাহকের একই স্থাপনায় নিয়মবহির্ভূতভাবে দুটি বাণিজ্যিক মিটার ১১ কেভিতে সংযোগ দেওয়া হয়। নীতিমালা অনুযায়ী ৮০ কিলোওয়াট পর্যন্ত লোডে সংযোগে ট্রান্সফরমার অফিস সরবরাহ করে, কিন্তু এখানে উদ্দেশ্যমূলকভাবে গ্রাহককে বিশেষ সুবিধা দিয়ে একই স্থাপনায় পরপর দুটি বাণিজ্যিক সংযোগ দেওয়া হয়। এতে গ্রাহককে বিনামূল্যে ৬টি ২৫ কেভি ট্রান্সফরমার সরবরাহ করে এবং দুটি এলটি মিটারিং করে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। অফিস বা সরকার মোটা অংকের আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

একইভাবে লোহাগাড়া সদরের ট্যান্ডলপাড়া এলাকার মো. আনোয়ার হোসেনের ১২ কিলোওয়াটের নির্মাণ সংযোগ আবেদনের বিপরীতে ডিজিএম রফিকুল ইসলাম খানের নির্দেশে কোনো অনুমোদিত স্টেকিং শিট ও কার্যাদেশ ছাড়াই মোটা অংকের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। অথচ গ্রাহকের আঙ্গিনায় একটি এক ফেজ নির্মাণ সংযোগ বিদ্যমান আছে।

আমিরাবাদ ইউনিয়নের খালেকের দোকান এলাকায় মো. ফরিদুল আলমের ৫০ কিলোওয়াটের রাইস মিলের আবেদনের বিপরীতে অনুমোদিত স্টেকিং শিট ও কার্যাদেশ ছাড়াই অনিয়মতান্ত্রিকভাবে একই ঠিকাদার কর্তৃক পুশ পোলসহ এক স্প্যান লাইন নির্মাণ ও ২৫*৩ কেভিএ ট্রান্সফরমার স্থাপন করে সার্ভিস ড্রপ প্রদান করা হয়। অনুমোদিত স্টেকিং শিট ও কার্যাদেশ ছাড়া ঠিকাদারকে স্টোর থেকে মালামাল ইস্যুর কোনো সুযোগ নেই। মালামাল ইস্যু না করা সত্ত্বেও কীভাবে লাইন নির্মাণ হলো তা যাচাই না করেই সংযোগ দেওয়া হয়েছে।

ভিলেজ ইলেকট্রিশিয়ান সেলিমের দুর্নীতি

ভিলেজ ইলেকট্রিশিয়ান সেলিম লোহাগাড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির নানা অপকর্মের মূলহোতা। তার বাড়ি লোহাগাড়া উপজেলা পূর্ব কলাউজান এলাকায়। সরেজমিনে দেখা যায়, কানুরাম বাজার থেকে আদারচর সড়কে সেলিমের বিলাসবহুল বাড়ি। রাস্তার পাশে বিশাল বাণিজ্যিক সাইনবোর্ড। একসঙ্গে দুটি বাড়ির নির্মাণ কাজ চলছে। একটি বাণিজ্যিক ভবনের নাম ‘আহমদ হোসেন টাওয়ার’। বিলবোর্ডে লেখা রয়েছে দোকান, অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ফ্যামিলি বাসা ভাড়া দেওয়া হবে।

আদারচর রাস্তার পশ্চিম পাশে সেলিমের আরও একটি আবাসিক ভবনের কাজ চলছে। এলাকাবাসী জানান, একসঙ্গে দুটি বাড়ির কাজ চলছে। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে কলাউজান এলাকায় বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে প্রকাশ্যে ভোট ডাকাতি করে সেলিম। তার বিরুদ্ধে কথা বললে অত্যাচার নেমে আসতো। কলাউজান এলাকায় হেলাল নামে এক বাসিন্দা তার বাড়ির উঠানের ওপর দিয়ে বিদ্যুতের লাইন নিতে বাধা দিলে সেলিম নিজ হাতে তাকে কুপিয়ে জখম করে। তারপরও ভয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

২০২৪ সালের ৬ আগস্ট লোহাগাড়া থানার তৎকালীন ওসি আরিফের রুমে বিক্ষুব্ধ লোকজন তাকে গণধোলাই দেয়। বর্তমানে সেলিম জামায়াত-বিএনপির ‘খাস লোক’ পরিচয় দিয়ে আবার নানা অপকর্ম শুরু করেছে। সেলিমের আমিরাবাদ স্টেশনে ‘ওয়েল ফুড’ নামে বিশাল শোরুম রয়েছে, এতে কোটি টাকার বিনিয়োগ। এ ছাড়া লোহাগাড়া উকিলের এলাকায় ‘ফ্রেশ বাইট’ নামে একটি বিশাল বেকারি রয়েছে। গত বছর প্রায় ৪ কোটি টাকার খরচ করে বটতলী কাঁচা বাজার ঠিকাদারি নিয়েছিলেন এই বিতর্কিত সেলিম।

ভিলেজ ইলেকট্রিশিয়ান সেলিম যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে কাজ করি। এখানে দালালির কিছু নেই।’ বিপুল সম্পদের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমি ল্যান্ডের ব্যবসা করি। আমিরাবাদে ‘হালাল ডাইন’ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দিয়েছিলাম, সেটি লস করেছি। ‘ওয়াল ফুড’ প্রতিষ্ঠানটি আমরা দুজনের। ‘ফ্রেশ বাইট’ প্রতিষ্ঠানটি ৯ জনের নামে। গত বছর আমিরাবাদ কাঁচা বাজার একটি সিন্ডিকেট করে ইজারা নিয়েছিলাম।’

ভিলেজ ইলেকট্রিশিয়ান মোজাম্মেল হকের অনিয়ম

ভিলেজ ইলেকট্রিশিয়ান মোজাম্মেল হকেরও অনিয়মের শেষ নেই। লোহাগাড়া উপজেলার লোহার দীঘির পাড়ে তার তিন তলা বাড়ি। পল্লী বিদ্যুতের অফিস ঘেঁষে রয়েছে ‘ইমতিয়াজ ইলেকট্রনিক্স’ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া নামে-বেনামে তার অঢেল সম্পদ। মোজাম্মেল হক যুগান্তরকে বলেন, ‘দুদক অভিযোগগুলো যাচাই করুক। বাড়িসহ আমার কাছে সবকিছু আছে।’

জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হাবিবুর রহমানের বক্তব্য

জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হাবিবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ অস্বীকার করছি। আমি এই অফিসে যোগদান করেছি মাত্র এক বছর। আমরা নিজেরাও অফিসকে দালালমুক্ত রাখার চেষ্টা করছি। আমি কোনো অনিয়মে জড়িত নই।’

ডিজিএম রফিকুল ইসলাম খানের বক্তব্য

পল্লী বিদ্যুৎ লোহাগাড়া জোনাল অফিসের ডিজিএম রফিকুল ইসলাম খান সোমবার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, ‘কিছু কিছু অনিয়ম হয়েছে, এসব আমার জানা আছে। যে কোনো সংস্থা তদন্ত করুক, সমস্যা নেই।’ ইলেকট্রিশিয়ান সেলিম ও মোজাম্মেল হকের কাছে পল্লী বিদ্যুৎ অফিস জিম্মি কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তারা হাইকোর্ট থেকে রায় নিয়ে আসছে যাতে অফিসে কাজ করতে পারেন।’ তবে তার কাছে রায়ের কপি নেই বলে জানান।

চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর সাবেক জিএম দীলিপ চন্দ্র চৌধুরী যুগান্তরকে জানান, ‘লোহাগাড়া জোনাল অফিসের কিছু গুরুতর অনিয়মের ব্যাপারে তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্ত করিয়েছি। তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গিয়েছিল। অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছিলাম। এরপর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে আমার জানা নেই।’