অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের দুর্নীতি তদন্তের আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের দুর্নীতি তদন্ত চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে হওয়া দুর্নীতি তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। রোববার রাতে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ আহ্বান জানান।

দুর্নীতি তদন্তের নির্দেশনা চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের একটি অস্থির সময় ছিল যমুনার অভ্যন্তর আর যমুনার কিনার মিলিয়ে। সেই সময়ে দেখেছি যাঁরা আজকে দুর্নীতির হিসাব নিতে বলছেন এবং ব্যবস্থা নিতে বলছেন; বিদেশি ঋণের কথা বলছেন।’ এ সময় অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের সবকিছুর (তদন্তের) জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) নির্দেশনা দিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি কোথায় হয়েছে, কীভাবে হয়েছে, কারা করেছে; সবকিছু খুঁজে বের করা হোক।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, টিআইবির (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বোচ্চ দুর্নীতি হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। তিনি আরও বলেন, ‘আমি বলছি না, পত্রিকাটি এখন আমার কাছে নেই; সবাই দেখেছেন।...তারা তো দায়মুক্তি পেতে পারে না।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

‘ইকোনমিকস অব প্লান্ডারিং’ ও অর্থ পাচার

এ সময় বিগত আওয়ামী লীগের গত ১৬ বছরের শাসনামলের অর্থনীতিকে ‘ইকোনমিকস অব প্লান্ডারিং’ (লুটপাটের অর্থনীতি) বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ওই সময়ে ব্যাংক খাত, উন্নয়ন প্রকল্প, কর অব্যাহতি ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে। সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বর্তমান সরকার নতুন অর্থনৈতিক দর্শনের ভিত্তিতে বাজেট প্রণয়ন করেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, করোনা মহামারি; গাজা, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের যুদ্ধসহ বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও জনগণের ওপর বাড়তি চাপ না দিয়ে সরকার মাত্র সাড়ে তিন মাসের প্রস্তুতিতে এই বাজেট দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে বাজেট করছি, যেটিকে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত করা হয়েছিল।’

অর্থনৈতিক প্রতিবেদনের তথ্য

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রস্তুত হওয়া ‘স্টেট অব দ্য বাংলাদেশ ইকোনমি (২০০৯-২০২৩)’ শীর্ষক প্রতিবেদনে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অভাব, ক্রোনি ক্যাপিটালিজম ও লাগামহীন দুর্নীতিকে অর্থনীতির সংকটের মূল কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন (১ হাজার ৬০০ কোটি) মার্কিন ডলার অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের কেলেঙ্কারি ঘটেছে এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতেও দলীয় প্রভাব ছিল।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, গত ১৫ বছরে শুধু উন্নয়ন প্রকল্প থেকেই ২৪ বিলিয়ন (২ হাজার ৪০০) ডলার রাজনৈতিকভাবে আত্মসাৎ হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের অনিয়মের অর্থ দিয়ে ১৪টি মেট্রোরেল ও ২৪টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা যেত। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও বাজেটের দর্শন

এ সময় প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘নিউ ইকোনমিক অর্ডার’ বা নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দরিদ্র মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছে দিয়ে সেই অর্থ অর্থনীতিতে পুনঃপ্রবাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এবারের বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কোনো নতুন কর আরোপ করা হয়নি। অতীতে বাজেটের আগে ও পরে বাজারে মূল্যবৃদ্ধির যে প্রবণতা দেখা যেত, এবার তা হয়নি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সহায়তা অব্যাহত থাকবে। এ খাতে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল রূপান্তর এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে বাজেটের মূল দর্শন হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।

বিদেশি ঋণ ও আইনশৃঙ্খলা

বিদেশি ঋণের প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিশ্বের প্রায় সব দেশই ঋণ নিয়ে বাজেট বাস্তবায়ন করে। তবে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়িয়ে ঋণনির্ভরতা কমানোর পথে এগোতে চায়। এ জন্য তিস্তা প্রকল্প ও পদ্মা ব্যারাজের মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অতীতের তুলনায় এখন মামলা গ্রহণের প্রবণতা বেড়েছে। অনেক অপরাধ আগে নথিভুক্তই হতো না। বর্তমানে অপরাধ সংঘটিত হলে দ্রুত মামলা নেওয়া, আসামি গ্রেপ্তার এবং বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিসংখ্যান তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কিছু ক্ষেত্রে মামলা বেড়েছে, তবে সেটি অপরাধ বেড়ে যাওয়ার চেয়ে অভিযোগ নথিভুক্ত হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধির ফল। সরকার এসব অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তিনি বলেন, পুলিশ একটি ভেঙে পড়া ব্যবস্থার মধ্যে দায়িত্ব নিয়েও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি জুয়া, মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাজেটের প্রশংসা ও আশাবাদ

বক্তব্যের শেষ দিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম বাজেট ঘোষণার পর কোনো মূল্যবৃদ্ধির ঢেউ দেখা যায়নি। এ বাজেট সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে বাজেট পাস হবে এবং এটি দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন ও জনগণের কল্যাণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।