একসময় দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। ডিএমপি কমিশনার, র্যাবের মহাপরিচালক এবং আইজিপি—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে তিনি যেমন ক্ষমতার দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, তেমনি বিভিন্ন বিতর্ক ও রাজনৈতিক সমালোচনারও কেন্দ্রে ছিলেন। এবার দুর্নীতির অভিযোগকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন এই সাবেক পুলিশপ্রধান।
দুর্নীতির অভিযোগ ও আদালতের নির্দেশ
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে বেনজীর আহমেদ ও তাঁর পরিবারের বিপুল সম্পদের তথ্য সামনে আসার পর আদালত একাধিক সম্পদ জব্দ এবং ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে রাজধানীর গুলশানে চারটি ফ্ল্যাট, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব, শত শত বিঘা জমি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার এবং সঞ্চয়পত্র। এই আদেশের ফলে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার পথ আরও সুগম হয়েছে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
কর্মজীবনের উত্থান
১৯৮৮ সালে সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন বেনজীর আহমেদ। কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসেন ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার হিসেবে। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ডিএমপি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর ২০১৫ সালের ১৫ জানুয়ারি র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান। টানা পাঁচ বছরের বেশি সময় র্যাবের নেতৃত্ব দেওয়ার পর ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল দেশের ৩০তম আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর অবসরে যান তিনি।
ক্ষমতার দৃশ্যমানতা ও বিতর্ক
অনেক বিশ্লেষকের মতে, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো পুলিশ প্রধান এতটা দৃশ্যমান, প্রভাবশালী ও রাজনৈতিকভাবে আলোচিত ছিলেন না। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমার মতে দেশের ইতিহাসে তিনিই সবচেয়ে দৃশ্যমান আইজিপি। তিনি যে ক্ষমতাধর, সেটি বোঝাতে কখনো কার্পণ্য করেননি।” আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অন্যতম মুখ ছিলেন বেনজীর আহমেদ। ২০২০ সালে সরকারি কর্মকর্তাদের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, “স্বাধীনতা, সংবিধান, রাষ্ট্র ও জাতির জনক কেউ স্পর্শ করতে পারবে না।” তাঁর এমন বক্তব্যকে অনেকেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দর্শনের প্রকাশ হিসেবে দেখেছেন।
বিতর্কিত অভিযান ও সমালোচনা
২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের শাপলা চত্বর কর্মসূচি উচ্ছেদ অভিযানে ঢাকার পুলিশ কমিশনার হিসেবে নেতৃত্ব দেন তিনি। পরে ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’ নামে পরিচিত ওই অভিযানে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি বলে দাবি করেছিলেন বেনজীর। যদিও ঘটনাটি নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনকে ঘিরে বিরোধী দলের আন্দোলন দমনে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের সামনে বালুভর্তি ট্রাক দিয়ে সড়ক অবরুদ্ধ করার ঘটনা তখন ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। সে সময় ডিএমপি কমিশনার ছিলেন বেনজীর আহমেদ।
র্যাবের মহাপরিচালক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ
র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগও বারবার উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবে তিনি সবসময় এমন অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন। বরং বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র র্যাব ও এর কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন বেনজীর আহমেদ। র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক হিসেবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা প্রথম বাংলাদেশি আইজিপি ছিলেন তিনি।
বিতর্কের অন্যান্য দিক
পেশাগত দায়িত্বের বাইরেও বিভিন্ন কারণে আলোচিত হয়েছেন বেনজীর। ২০২১ সালে চিত্রনায়িকা পরীমণিকে কেন্দ্র করে ঢাকার বোট ক্লাবে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় আসেন বেনজীর আহমেদ। ঘটনার পর জানা যায়, তিনি ওই বাণিজ্যিক ক্লাবের সভাপতি। একজন কর্মরত আইজিপি কীভাবে এমন অভিজাত ক্লাবের নেতৃত্বে থাকতে পারেন এবং ক্লাবটির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার আর্থিক উৎস কী—এসব প্রশ্ন জাতীয় সংসদ পর্যন্ত গড়ায়।
অবসর ও নতুন বিতর্ক
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থান করায় বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ গুরুত্ব পায়নি। তবে অবসরের পর দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসার পর তাঁর কর্মকাণ্ড ও সম্পদ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। যদিও সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন বেনজীর আহমেদ। সম্প্রতি এক ভিডিও বার্তায় তিনি দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং অবসরের পর তাঁকে দুর্নীতিবাজ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
পরিণতি কী?
দুদকের অনুসন্ধান ও আদালতের বিভিন্ন আদেশের পর এখন আলোচনার কেন্দ্রে একটাই প্রশ্ন—দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর কর্মকর্তাদের একজন হিসেবে পরিচিত বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের শেষ পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা



