অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুদকের কার্যক্রমে উত্থান-পতন
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই দুর্নীতিবিরোধী অভিযান জোরদারের ঘোষণা দেয়। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে এ সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার কার্যক্রমে দৃশ্যমান গতি ফিরে পায়। বিশেষ করে অনুসন্ধান, মামলা দায়ের এবং তদন্ত শেষে চার্জশিট দাখিলের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতেও জোর তৎপরতা চালায় সংস্থাটি।
দুদক চেয়ারম্যানের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়ন
দায়িত্ব গ্রহণের পর দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন বলেছিলেন, দুদককে আর ‘ঘুমন্ত প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে থাকতে দেওয়া হবে না। বড় দুর্নীতির বিরুদ্ধে দ্রুত অনুসন্ধান এবং দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। জনগণের আস্থা ফেরাতে ‘চুনোপুঁটি নয়, রাঘববোয়াল’ ধরার নীতিও তুলে ধরা হয়। সরকারের নৈতিক সমর্থনে অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন বড় দুর্নীতির অভিযোগে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান, মামলা ও চার্জশিট দিতে সক্ষম হয় মোমেন কমিশন।
প্রথম ১১ মাসের নজরকাড়া অগ্রগতি
দুদক সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রথম ১১ মাসে মোট ১৬ হাজার ৩২৭টি অভিযোগ জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে এর মধ্যে ১২ হাজার ৮২৭টি আমলে নেওয়া হয়। অনুসন্ধান শুরু করা হয় ৭৬৮টি অভিযোগের। অনুসন্ধান শেষে মামলা করা হয় ৩৯৯টি। মামলার তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয় ৩২১টি। এসব অভিযোগপত্রে ৫৪৯ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।
- অভিযুক্তদের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী রয়েছেন।
- পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি ১০ মামলার মধ্যে গড়ে আটটিতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে।
- এটি অতীতের তুলনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আইন সংশোধন ও কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুদকের ক্ষমতা বাড়াতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংশোধিত প্রস্তাবে কমিশনার সংখ্যা তিন থেকে বাড়িয়ে পাঁচ করার কথা বলা হয়। যেখানে একজন নারী কমিশনার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি মানি লন্ডারিংসহ নতুন ধরনের অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান জোরদারের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর এ বিষয়ে একটি অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার, যা সংসদে অনুমোদন পেলে আইনে পরিণত হবে।
শেষের দিকে গতি কমে যাওয়া ও স্থবিরতা
অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতে দুদকের কার্যক্রমে যে গতি দেখা গিয়েছিল, তা সময়ের সঙ্গে কমতে থাকে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পরবর্তী সাত মাসে দুদকের কার্যক্রমের গতি কিছুটা হ্রাস পায়। এ সময়ে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করা হয় ২৬০টি অভিযোগের। মামলা করা হয় ১৪৫টি। তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দেওয়া হয় ১১০টি। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পর কমিশন শূন্য হয়ে পড়লে দুদকের কার্যক্রমে বড় ধরনের স্থবিরতা দেখা দেয়।
কোন ধরনের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যেসব অভিযোগে অনুসন্ধান ও মামলা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন
- বড় বড় প্রকল্পে দুর্নীতি
- প্লট ও জমি বরাদ্দে অনিয়ম
- ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাৎ
- মানি লন্ডারিং ও বিদেশে অর্থ পাচার
এসব অভিযোগের মামলায় সাবেক মন্ত্রী, এমপি, আমলা ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান ও মামলা করা হয়েছে।
দুদক কর্মকর্তার বক্তব্য
দুদকের কার্যক্রমে ভাটা পড়ার জন্য কমিশন শূন্য হওয়াকে দায়ী করছে সংস্থাটির উপ-পরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম। তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতে অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম বেড়েছিল। তবে, বর্তমানে কমিশন না থাকায় নতুন কোনও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চলমান অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুদকের কার্যক্রমে যে গতি ও অগ্রগতি দেখা গিয়েছিল, তা শেষের দিকে কমিশন শূন্যতার কারণে স্থবিরতায় রূপ নেয়। তবুও প্রথম দফার অগ্রগতি দুদকের সক্ষমতা ও সম্ভাবনার বার্তা বহন করে চলেছে।



