গণপূর্ত অধিদফতরে দুর্নীতির অভিযোগ: তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলম খানের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট গঠনের অভিযোগ
গণপূর্ত অধিদফতরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট তৈরি করে ঠিকাদারদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ দিয়েছেন ঠিকাদাররা, কিন্তু প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে, তার দুর্নীতির বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন ও পদায়ন নিয়ে বিতর্ক
গত ২৮ অক্টোবর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে মোহাম্মদ শামীম আখতারকে প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব থেকে সরিয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (রিজার্ভ) পদে পদায়ন করা হয়। একই প্রজ্ঞাপনে মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়। গ্রেডেশন তালিকা অনুযায়ী, খালেকুজ্জামানের আগে মো. আশরাফুল আলম, ড. মো. মঈনুল ইসলাম, মো. শামছুদ্দোহা ও মো. আবুল খায়ের রয়েছেন। তাদের বাদ দিয়ে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে খালেকুজ্জামানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
খালেকুজ্জামানের হাত ধরেই গণপূর্ত অধিদফতর নিজেদের হারানো গৌরব উদ্ধার করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছিল, কিন্তু তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী সাভার গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সমালোচনার মুখে পড়ছে অধিদফতর।
রাজনৈতিক প্রভাব ও সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ
গণপূর্ত অধিদফতরের দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বদরুল আলম খান তাদের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে গণপূর্ত অধিদফতরে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। তিনি নানা সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ওবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর কাছের লোক হিসেবে পরিচিতি ছিলেন বদরুল। একই এলাকায় বাড়ি হওয়ায় সে সময়ে নিয়োগ ও বদলি নিয়েও অভিযোগ ওঠে। এর আগে ভোলার নির্বাহী প্রকৌশলী থাকার সুবাদে সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় নানা সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে।
সিন্ডিকেট গঠন ও ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
কুমিল্লার একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বদরুল আলম খান একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে গণপূর্তে ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। তিনি ভোলা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকার ঠিকাদারদের একটি শক্তিশালী গ্রুপ তৈরি করেছেন। ঢাকার বিভিন্ন ডিভিশন ছাড়াও চট্টগ্রাম, সিলেট ও কুমিল্লার প্রকৌশলীদের ভয় দেখিয়ে এই সিন্ডিকেটকে কাজ দিতে চাপ সৃষ্টি করছেন।
গত ডিসেম্বরে কুমিল্লার ইএম-এর একটি টেন্ডারে ভুয়া সার্টিফিকেটধারী এক ঠিকাদারকে কাজ দিতে কুমিল্লার প্রকৌশলী এবং ঢাকার এমআইস সেলের প্রকৌশলীকে চাপ দেন। পরে এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ ছাড়া মিরপুরে আসিফ নামে এক ঠিকাদারকে কাজ দিতে প্রকৌশলীদের চাপ দিয়েছেন। তার সুপারিশে ইতিমধ্যে পুলিশের বিভিন্ন থানার ভবন ও অন্যান্য সরকারি প্রকল্পের কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন আসিফ।
অনিয়ম ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ‘ক’ ও ‘জ’ অদ্যক্ষরের দুই ঠিকাদার জানান, বদরুল আলম ও আসিফের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে। বদরুল আলম ফোনে বিভিন্ন নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং তাদের চাপ দেন আসিফকে কাজ দিতে। মিরপুর পাইকপাড়া আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পের আরবরিকালচার কাজ নিয়েও অভিযোগ আছে। ল্যান্ডস্কেপিং ও গাছ লাগানোর কাজ আরবরিকালচার বিভাগের দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও বদরুল আলম ওই কাজ মিরপুর বিভাগের মাধ্যমে টেন্ডার করান, যা সম্পূর্ণ অবৈধ বলে অভিযোগ।
পুলিশের ১০৭ থানা নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় মিরপুর গণপূর্ত বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন ভাষানটেক থানার কাজের টেন্ডারও তার পছন্দের ঠিকাদারকে দিতে বাধ্য করেছেন। এ ছাড়াও বদরুল আলম ভাইদের দিয়ে ডেভেলপার ব্যবসা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নিরপেক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্ত করলে তার এসব কর্মকাণ্ড বেরিয়ে আসবে বলে জানান তারা।
বদলি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
গত ৩ ফেব্রুয়ারি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা-৭ থেকে জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনে বদরুলকে সাভার সার্কেল থেকে ঢাকা গণপূর্ত-১ নম্বর সার্কেলে বদলি করা হয়। কিন্তু এই সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (কুমিল্লা) ওসমান গনিকে সুপারিশ করেছিলেন সচিব নজরুল ইসলাম। পরে কুমিল্লা জামায়াতের এক নেতাকে দিয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত উপদেষ্টাকে ম্যানেজ করে সচিবকে ফোন করান বদরুল। এ নিয়ে তোলপাড় হয় গণপূর্ত অধিদফতরে। এখনও সপদে থেকে অনিয়ম করছেন বলে অভিযোগ আছে।
এসব ব্যাপারে জানতে মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
