নেত্রকোনার কলমাকান্দায় চোরাই পথে আনা ভারতীয় প্রসাধনী ছাড়াতে ঘুষের দর-কষাকষির অভিযোগে পুলিশের এক উপপরিদর্শককে (এসআই) প্রত্যাহারের পর এবার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সিদ্দিক হোসেনকে বদলি করা হয়েছে। তাঁকে কেন্দুয়া উপজেলার পেমই পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে বদলি করা হয়। আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নেত্রকোনা পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
এর আগে গতকাল অভিযুক্ত এসআই মো. আবু হানিফাকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়। তবে পুলিশ সুপার বলেন, ওসির বদলিটি মূলত রুটিনমাফিক বদলি। মাস শেষে কাজের একটি মূল্যায়ন করা হয়। সেখানে কে ভালো করলেন, কে মন্দ করলেন, তার ওপর বেশ কিছু বিষয় নির্ভর করে। কলমাকান্দায় নতুন ওসি হিসেবে আবুল হাশেম নামের একজন পরিদর্শককে পদায়ন করা হয়েছে।
অভিযানের বিবরণ
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার গভীর রাতে উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের রাঙ্গামাটিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ একটি পিকআপ থেকে ১৮ বস্তা ভারতীয় প্রসাধনী জব্দ করে। এ সময় পিকআপের চালক নাজিরপুরের শিংপুর গ্রামের নাছিম (২৩) ও তাঁর সহকারী সেইচাহানি গ্রামের মনির হোসেনকে (২১) আটক করা হয়।
মামলা ও অডিও প্রকাশ
এ ঘটনায় উপজেলার রাজনগর গ্রামের জসিম উদ্দিনসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করা হয়। জসিমকে চোরাই পণ্যের মূল হোতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়; কিন্তু গতকাল বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসআই আবু হানিফা ও জসিম উদ্দিনের কথোপকথনের দুটি অডিও ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম অডিওটির দৈর্ঘ্য ৫ মিনিট ২৩ সেকেন্ড। এতে জসিমকে বলতে শোনা যায়, ‘স্যার, আপনাকে ৮০ হাজার টাকা দেব। আপনি আমাকে মামলা দেবেন না। শুধু দুই বস্তা মাল আটক দেখাবেন।’ এক ব্যক্তিকে (যাঁকে এসআই আবু হানিফা বলে দাবি করা হচ্ছে) বলতে শোনা যায়, ‘না ভাই, যা বলছি, তার কম হবে না। আপনি তিন লাখ টাকা দেন।’
কথোপকথনের এক পর্যায়ে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘এক লাখ টাকা দেব। ওসি স্যার কিন্তু বিপক্ষে যাবে না। ওসি স্যার বলছেন, যেহেতু আমাকে জানিয়ে আপনারা করেছেন, দারোগার সঙ্গে কথা বলেন।’ রাত ১টা ৪১ মিনিটে রেকর্ড করা বলে দাবি করা দ্বিতীয় অডিওটির দৈর্ঘ্য ৩ মিনিট ১২ সেকেন্ড। এতে ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলে দাবি করা ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনি যা করবেন, তাড়াতাড়ি করেন। আমি এখন ভবানীপুর ব্রিজ পার হচ্ছি...আপনার জন্য আমি ছাড় দিলাম, আড়াই লাখ টাকা নিয়ে আসেন।’ এর জবাবে জসিমকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি কষ্ট করে হলেও আপনাকে দুই লাখ টাকা দিচ্ছি। আমাকে একটু সময় দেন।’
একপর্যায়ে ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘দেইখেন, হোয়াটসঅ্যাপে কথা অন্য ফোনে রেকর্ড করা যায়, এটা করবেন না।’
প্রতিক্রিয়া ও তদন্ত
ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হলে এসআই আবু হানিফাকে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সজল কুমার সরকারকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত এসআই আবু হানিফা ও জসিম উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বন্ধ পাওয়া যায়।
আজ সন্ধ্যায় কলমাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সরকারি মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে ফোন রিসিভ করে মো. সিদ্দিক হোসেন বলেন, ‘আমার বদলির অর্ডার হয়েছে। আর চোরাই পণ্য নিয়ে যে কাণ্ড ঘটেছে, এসব ঘটনার সঙ্গে আমি কোনোভাবেই জড়িত নই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন স্যারেরা তদন্ত করছেন।’



