রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিপাত্রে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ শুরু হয়েছে গত ২৮ এপ্রিল। আগামী আগস্ট নাগাদ সেখান থেকে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। আর তার মধ্য দিয়ে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় নাম ওঠাবে বাংলাদেশ। দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্যও ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উদ্ধৃত করে এমন সব বক্তব্য ছাড়াচ্ছে ফেসবুকে, যা তাঁরা বলেননি।
মির্জা ফখরুল ও তারেক রহমানের নামে ভুয়া ফটোকার্ড
কয়েক দিন ধরেই ফেসবুকে ক্ষমতাসীন বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামে একটি ফটোকার্ড ঘুরছে, যেখানে তাঁকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্বপ্ন ছিল একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের, তারেক রহমান তা করে দেখালেন।’ বিভিন্ন পেজ থেকে এই ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়েছে, এর মধ্যে একটি পেজের পোস্ট শেয়ার হয়েছে শতাধিকবার। তাতে সাড়ে ৮ হাজার প্রতিক্রিয়া পড়েছে, মন্তব্য জমা হয়েছে ৫ শতাধিক। অথচ মির্জা ফখরুলের এই বক্তব্যের কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায়নি। প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ডে অনুসন্ধান করলেও কোনো সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায়নি এ বিষয়ে কিছু।
ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট থেকে অপতথ্যের সৃষ্টি
আরও অনুসন্ধান চালিয়ে ২৮ এপ্রিল গুপ্ত টেলিভিশন নামের একটি স্যাটায়ার পেজে এই কার্ড পাওয়া যায়। ওই ব্যঙ্গাত্মক পোস্টকে সত্য বলে প্রচার করা হচ্ছে এবং তাতে বিভ্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। পেজটিতে আরও অনেক ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট পাওয়া যায়। তার মধ্যে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি জাকির খানের ছবিসহ আরেকটি কার্ড। যেখানে তাঁকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘মাত্র দুই মাসেই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়ে ফেলছেন। তারেক রহমান পাঁচ বছর থাকলে আমরা পারমাণবিক বোমাও বানিয়ে ফেলব।’ একই পেজ থেকে ২৯ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শেহরীন আমিন ভূঁইয়াকে (মোনামী) উদ্ধৃত করে আরেকটি পোস্টে বলা হয়, ‘তারেক রহমানের অনেক সমালোচনা করেছি, কিন্তু পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো যুগান্তকারী প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করার জন্য আজকে ধন্যবাদ জানাই।’
অধ্যাপক ইউনূসের নামেও অপতথ্য
দুই মাস আগে বিদায় নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ছবি সংযুক্ত করে গত ২৭ এপ্রিল ‘গজব ভিশন’ নামক একটি স্যাটায়ার পেজে পোস্ট করা একটি ব্যঙ্গাত্মক পোস্টও সত্য দাবি করে ছড়ানো হচ্ছে। তাতে অধ্যাপক ইউনূসকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরিতে আমার অবদান আছে।’ অথচ এমন কথা তিনি বলেছেন, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ‘গজবভিশন’ পেজটির লোগোটি তৈরি করা হয়েছে টেলিভিশন চ্যানেল ‘বাংলাভিশন’-এর লোগোর আদলে। ফলে তা দেখে বিভ্রান্তির সুযোগ তৈরি হয়।
সালাহউদ্দিন আহমদ ও জিয়াউর রহমানের নামে ভুয়া বক্তব্য
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদকে নিয়েও দুটি ফটোকার্ড প্রচারিত হচ্ছে। একটি ফটোকার্ড তাঁকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘সর্বপ্রথম শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।’ ২৯ এপ্রিল ‘দৈনিক মোল্লার দেশ’ নামে একটি স্যাটায়ার পেজের ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট থেকে কার্ডটি তৈরি করা হয়। আরেকটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম সূত্রটি আবিষ্কার করেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান’। এই কার্ড করা হয় আরটিভির ফটোকার্ডের নকশার আদলে। যাচাই করে দেখা যায়, গত ২৮ এপ্রিল আরটিভিতে প্রকাশিত সালাহউদ্দিন আহমদের মন্তব্যসংবলিত ভিন্ন একটি ফটোকার্ড সম্পাদনার মাধ্যমে আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে। গত ২৮ এপ্রিল প্রকাশিত আরটিভির ফটোকার্ডে বক্তব্যটি ছিল, ‘সেনাবাহিনীর সদস্যদের ব্যারাকে ফেরানোর বিষয়ে যে বার্তা দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী’। ওই বক্তব্য বদলে দিয়ে ভুয়া বক্তব্যের ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়।
অন্যান্য নেতাদের নামেও ভুয়া বক্তব্য
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুও এমন অপতথ্যের শিকার হয়েছেন। ‘মাত্র দুই মাসে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করে নজির স্থাপন করলেন তারেক রহমান’—তাঁর নামে এমন বক্তব্য ছড়ানো হলেও তার কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি। বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীকে উদ্ধৃত করেও ‘অবশেষে আমরা পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে প্রবেশ করলাম। যেটা আওয়ামী লীগ সরকার ১৭ বছরে করতে পারে নাই, তারেক রহমান সেটা মাত্র দুই মাসে করে দেখিয়েছেন।’ এমন ভুয়া প্রচার হচ্ছে।
লোডশেডিং নিয়েও ভুয়া খবর
গত মাসে বিদ্যুতের লোডশেডিং নিয়ে ফেসবুকে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ব্যক্তি ও জনপরিচিত মুখের নামে ভুয়া মন্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এসব ক্ষেত্রে ফটোকার্ড, ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট বা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন দাবি ব্যবহার করে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে। যেমন রুহুল কবির রিজভীর ছবি সংযুক্ত একটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে দাবি করা হয়, তিনি বলেছেন, ‘গ্রামে বাতাস থাকে, এ কারণে সেখানে বেশি লোডশেডিং দেওয়া হয়।’ অনুসন্ধানে দেখা যায়, এটি স্যাটায়ার পেজ ‘গুপ্ত টিভি’র একটি পোস্ট। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর নামেও একটি বক্তব্য ছড়ানো হয় যে তিনি বলেছেন, ‘দেশে লোডশেডিং আছে দেখাতে পারলে মন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিব।’ অনুসন্ধানে দেখা যায়, ‘Sojun Ahammed’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে গত ২২ এপ্রিল একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়, যার ক্যাপশনে ‘funny’সহ কয়েকটি হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করা হয়েছিল। পেজটির বায়োতেও লেখা আছে, ‘যাহা বলিব সত্য বলিব, বিপদে পড়িলে মিথ্যা বলিব’ এবং সেখানে নিয়মিত এ ধরনের কনটেন্ট পোস্ট করা হয়। এতে এটা অনেকটাই স্পষ্ট, আলোচিত ফটোকার্ডটি মূলত ব্যঙ্গাত্মক বা সার্কাজম পোস্ট হিসেবেই তৈরি হয়েছিল।
আবার প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের নামেও একটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে দাবি করা হয় যে তিনি বলেছেন, ‘এই সামান্য লোডশেডিংয়ে যদি এতই সমস্যা হয়, তাহলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করুন। কারেন্ট বিলও দিতে হবে না।’ তবে তাঁর এই বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্য কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি। এদিকে জনপ্রিয় কবি, গীতিকার ও অভিনেতা মারজুক রাসেলের নামেও একটি মন্তব্য ছড়িয়েছে। দাবি করা হচ্ছে, ‘কারেন্ট দে হারামজাদা, নইলে খাম্বা চিবিয়ে খাবো’ মন্তব্যটি তাঁর। কিন্তু যাচাই করে মারজুক রাসেলের এমন কোনো মন্তব্যের ভিত্তি পাওয়া যায়নি। কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র বা সংবাদমাধ্যমে তাঁর এমন কোনো মন্তব্য আসেনি, তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজেও এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। মারজুক রাসেল তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ‘রিউমর স্ক্যানার’কে নিজেই বলেছেন, তিনি এমন কোনো মন্তব্য করেননি।



