চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর তিনটি অনিয়মের ঘটনা তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নিয়োগ ও পদোন্নতি, উন্নয়নকাজে ঠিকাদার নিয়োগ এবং বর্জ্য সংগ্রহে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনায় এই তদন্ত শুরু হয়েছে।
তদন্তের নথি চেয়েছে দুদক
সাবেক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর ব্যক্তিগত নথি, তাঁর আমলে চাকরি পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্র, ২৫টি উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেওয়ার কাগজপত্র এবং বর্জ্য সংগ্রহের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার চুক্তিপত্রসহ যাবতীয় নথিপত্র চেয়েছে দুদক। সাত কর্মদিবসের মধ্যে দুদক নথিপত্র জমা দেওয়ার কথা বলেছে।
চিঠি প্রেরণ
১৬ এপ্রিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেনকে চিঠি দিয়েছেন দুদকের সহকারী পরিচালক মো. রাজু আহমেদ। তিনি তদন্তের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা হিসেবে আছেন। বর্তমান মেয়রকে চিঠি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদক কর্মকর্তা মো. রাজু আহমেদ।
চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও আইন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সাবেক মেয়রের পটভূমি
চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের (কার্যক্রমক নিষিদ্ধ) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রেজাউল করিম চৌধুরী ২০২১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মেয়রের দায়িত্ব নেন এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ১৯ আগস্ট তাঁকে অপসারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার।
নিয়োগে অনিয়ম
যেসব নথি চেয়েছে দুদক সাবেক মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর আমলে শ্রমিক, কর আদায়কারী, অফিস সহায়ক, সড়ক তদারককারী, সুপারভাইজার, সড়ক পরিদর্শকসহ বিভিন্ন পদে বিপুলসংখ্যক লোক নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর মেয়াদের শেষ ২ বছরে অন্তত ১৮৮ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
এখন দুদক এসব পদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদন, নিয়োগ পরীক্ষার রেকর্ডপত্র, নিয়োগপত্রসহ যাবতীয় রেকর্ডপত্র চেয়েছে।
সাবেক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর আমলের নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম নিয়ে গত বছরের ৪ জুলাই প্রথম আলোর শেষ পাতায় ‘শ্রমিক থেকে “এক লাফে” প্রকৌশলী, কর আদায়কারী’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দিয়েই একলাফে উচ্চ গ্রেডের পদে পদায়ন করা হয়েছে অন্তত ৬৪ জনকে। চসিকের জনবলকাঠামো অনুযায়ী, শ্রমিক পদ ২০তম গ্রেডের। কিন্তু সেখান থেকে ১০ম গ্রেডের উপসহকারী প্রকৌশলী, ১৬তম গ্রেডের কর আদায়কারী বা অনুমতিপত্র পরিদর্শক পদে পদায়ন করা হয়েছে। এ ধরনের পদোন্নতিতে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
চসিকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তখনকার মেয়র, ওয়ার্ড কাউন্সিলর, কিছু কর্মকর্তা ও শ্রমিকনেতাদের সুপারিশেই এসব নিয়োগ হয়েছিল। ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের জন্য পরীক্ষা ছাড়াই চাকরির ব্যবস্থা করা হয়। পরে তাঁদের পদায়ন করা হয় গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে।
ঠিকাদার নিয়োগে অনিয়ম
এদিকে রেজাউল করিম চৌধুরীর আমলে সিটি করপোরেশনের আড়াই হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালককে মারধরের ঘটনা ঘটেছিল। কাজ ভাগ-বাঁটোয়ারায় রাজি না হওয়ায় ২০২৩ সালের ২৯ জানুয়ারি প্রকৌশলী মো. গোলাম ইয়াজদানীকে মারধর করেছিলেন ঠিকাদাররা।
এখন দুদক ২০২২ সালের অক্টোবরে সিটি করপোরেশনের ২৫টি প্রকল্পের সংক্ষিপ্ত বিবরণ, দরপত্রের ধরন, প্রাক্কলন, বিজ্ঞপ্তি, ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেওয়ার সময়, ঠিকাদারের নাম-ঠিকানা, মুঠোফোন নম্বর ও চুক্তিমূল্য এবং কাজের বর্তমান অগ্রগতি জানতে চেয়েছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম
সাবেক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর আমলে নগরের চার ওয়ার্ডে বাসাবাড়ি ও দোকান-অফিস থেকে সরাসরি বর্জ্য সংগ্রহের (ডোর টু ডোর) জন্য তিনটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছিল সিটি করপোরেশন। এগুলো হচ্ছে মেসার্স পাওয়ার সোর্স, ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রাইভেট সার্ভিস ও চান্দগাঁও ক্লিনার্স সার্ভিস। প্রতিষ্ঠানগুলো তৎকালীন মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী ও এক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ঘনিষ্ট ব্যক্তির প্রতিষ্ঠান বলে জানা গেছে।
এখন এই ব্যাপারে দেওয়া বিজ্ঞপ্তি, নিয়োগ কমিটির কর্মকর্তাদের তালিকা, প্রতিবেদন ও চুক্তিপত্রের যাবতীয় রেকর্ডপত্র দিতে বলেছে দুদক।



