সরকারের প্রথম ১০০ দিন: টিআইবির মিশ্র প্রতিক্রিয়া, প্রশংসা ও উদ্বেগ একসঙ্গে
সরকারের প্রথম ১০০ দিন: টিআইবির মিশ্র প্রতিক্রিয়া

নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনে কিছু ব্যতিক্রমী ও ইতিবাচক উদ্যোগের প্রশংসা করলেও সুশাসন, জবাবদিহি ও দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির ভাষ্য, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে সদিচ্ছার কিছু নজির থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার বদলে কয়েকটি সিদ্ধান্তে ‘পিছু হটার’ ইঙ্গিত মিলেছে, যা জনগণের প্রত্যাশা ও নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সংবাদ সম্মেলনে মূল্যায়ন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সরকারের ১০০ দিনের কার্যক্রম নিয়ে রবিবার (৭ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে টিআইবি। ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সরকারের ১০০ দিন: সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন’ শীর্ষক এই মূল্যায়নে জাতীয় সংসদ, বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ, স্থানীয় সরকার, মানবাধিকার, তথ্য অধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা ড. সুমাইয়া খায়ের, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামানসহ সংস্থাটির অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইতিবাচক পদক্ষেপ

টিআইবির পর্যবেক্ষণে সরকারের কয়েকটি সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট সুবিধা বাতিল, প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি প্রটোকল সীমিত করা, ব্যক্তিগত সফরে সরকারি সুবিধা ব্যবহার করলে নিজ খরচে তা পরিশোধের নির্দেশনা, সরকারি কর্মচারীদের সময়মতো অফিসে উপস্থিতি নিশ্চিতের উদ্যোগ এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা। এছাড়া তিন ধাপে নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত এবং সংসদের প্রথম অধিবেশনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রশ্নোত্তর ও আলোচনায় অংশগ্রহণকেও ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।

‘নতুন নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত আছে, কিন্তু নতুন শাসনব্যবস্থা নয়’

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে কিছু প্রশংসনীয় ও অভূতপূর্ব নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত দেখা গেলেও তা থেকে নতুন ধরনের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

তার মতে, সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার, ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার পরিকল্পনা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষ করে সুশাসন, দুর্নীতিদমন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে এসব পদক্ষেপ উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সংস্কার থমকে যাওয়ার অভিযোগ

টিআইবির অন্যতম প্রধান উদ্বেগ হলো অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ। সংস্থাটির দাবি, বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো কার্যকর না করে স্থগিত বা বাতিলের পথে হাঁটা হয়েছে। অথচ এসব উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি বাড়াতে সহায়ক হতে পারতো। অন্যদিকে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা বাড়ানোর অভিযোগ রয়েছে, এমন কিছু অধ্যাদেশ দ্রুত আইনে রূপ দেওয়া হয়েছে, যা সংস্কার প্রত্যাশীদের হতাশ করেছে।

স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের বদলে নিয়ন্ত্রণ?

টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দুদক, মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন শীর্ষ পদে নিয়োগ না দেওয়া বা পুনর্গঠন বিলম্বিত হওয়ায় কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।

সংস্থাটি আরও অভিযোগ করেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নির্বাচন এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের পুনর্গঠনে দলীয় বিবেচনার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। ফলে অতীতের রাজনৈতিককরণের সংস্কৃতি পুরোপুরি দূর হয়নি।

সংসদ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন

প্রতিবেদনে বলা হয়, সংসদের অধিকাংশ স্থায়ী কমিটি এখনও গঠন না হওয়ায় নির্বাহী বিভাগের ওপর কার্যকর নজরদারি দুর্বল হয়েছে। একইসঙ্গে বিশেষ কমিটিগুলোতে ক্ষমতাসীন জোটের নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখা হয়েছে।

বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদারের পরিবর্তে নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

প্রশাসন ও ব্যাংক খাতে পুরোনো সংস্কৃতির অভিযোগ

প্রশাসনে মেধাভিত্তিক নিয়োগের ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ বহাল রয়েছে বলে দাবি করেছে টিআইবি।

ব্যাংকিং খাত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। তাদের মতে, আর্থিক খাতে জবাবদিহি ও তদারকি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ এবং দুর্বল ব্যাংকের পুরোনো মালিকদের পুনরায় সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ সংস্কারের বার্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

গণমাধ্যম, মতপ্রকাশ ও মানবাধিকার

টিআইবির হিসাবে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে ১৩০টি ঘটনায় ১৮৮ জন সাংবাদিক হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং সাত জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সংস্থাটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, সাইবার সুরক্ষা আইনের কিছু বিতর্কিত ধারা বাকস্বাধীনতা সীমিত করার জন্য ব্যবহার হতে পারে। পাশাপাশি সরকারি ওয়েবসাইট থেকে গুরুত্বপূর্ণ নথি ও তথ্য সরিয়ে আর্কাইভ করার ঘটনাকেও তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ

টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিল মাসে দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড, ২৯৪টি ছিনতাই, ১৯৬টি অপহরণ এবং প্রায় সাড়ে তিন হাজার নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে মব সহিংসতা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর ওপর হামলা, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। টিআইবির মতে, এসব ঘটনা মোকাবিলায় সরকারের দৃশ্যমান অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তব ফলাফল এখনও প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল।

সার্বিক মূল্যায়ন

সার্বিক মূল্যায়নে টিআইবি বলছে, সরকারের প্রথম ১০০ দিন পুরোপুরি ব্যর্থতার নয়; বরং এতে সম্ভাবনার পাশাপাশি সতর্কবার্তাও রয়েছে। সংস্থাটির মতে, প্রতীকী ও প্রশাসনিক কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ জনমনে আশা তৈরি করেছে। তবে সেই আশাকে টেকসই করতে হলে দুর্নীতি প্রতিরোধ, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন এবং কার্যকর জবাবদিহির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন। না হলে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি কেবল ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি রয়েছে।