বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা: পুনর্গঠনের চিন্তা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার গঠনের পর বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম ব্যস্ততায় থমকে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ও কাউন্সিল না হওয়ায় তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত তৈরি হয়েছে স্থবিরতা। এ অবস্থায় সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে সংগঠনকে চাঙা করতে কেন্দ্রীয় কমিটি ও অঙ্গসংগঠন পুনর্গঠনের চিন্তায় দলটি।
নেতাকর্মীদের উদ্বেগ ও প্রত্যাশা
নেতাকর্মীদের মতে, নির্ধারিত সময়ে নতুন কমিটি ঘোষণা না হওয়ায় একদিকে সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে নতুন নেতৃত্ব তৈরির পথও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন সম্মেলন না হওয়ায় অনেক পদবঞ্চিত কর্মী সংগঠন থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। একই কমিটি দীর্ঘদিন থাকার ফলে অভ্যন্তরীণ কোন্দলও বাড়ছে।
সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো পুনর্গঠন করা গেলে দল সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী হবে এবং নির্বাচনে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা।
অঙ্গসংগঠনের বর্তমান অবস্থা
দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী ১১টি সংগঠনের মধ্যে ১০টিরই মেয়াদোত্তীর্ণ। দলীয় গঠনতন্ত্রে প্রতি তিন বছর পর নতুন কমিটি গঠনের বিধান থাকলেও দীর্ঘদিন তা বাস্তবায়ন হয়নি। এতে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতৃত্বের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
একই পরিস্থিতি মূল দল বিএনপিতেও। সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল হয়েছিল ২০১৬ সালের মার্চে। নিয়ম অনুযায়ী তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও এক দশকেও তা হয়নি। তবে এই সময়ে নির্বাহী কমিটিতে একাধিকবার পরিবর্তন আনা হয়েছে।
পুনর্গঠনের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
দলীয় নেতারা বলছেন, আপাতত সরকারের কার্যক্রম পরিচালনাই শীর্ষ নেতৃত্বের প্রধান অগ্রাধিকার। তাই চলতি বছর জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো পুনর্গঠনের চিন্তা রয়েছে দলটির।
জানা যায়, আসন্ন ঈদুল ফিতরের পর থেকেই অঙ্গসংগঠনগুলো ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থাকায় দলীয় নেতারা সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন।
বিএনপি নেতাদের বক্তব্য
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, "দলের জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি। সরকার গঠনের পর আমরা নানা কাজে ব্যস্ত। সংসদীয় কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু হওয়ার পর হয়তো সাংগঠনিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে।"
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য জানান, "আপাতত মূল দলের পুনর্গঠন বা জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে আলোচনা নেই। তবে অঙ্গসংগঠনের অনেক শীর্ষ নেতা এবং জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের কেউ কেউ জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সংসদে গেছেন। এখন অঙ্গসংগঠনগুলো পুনর্বিন্যাসের সময় এসেছে।"
অঙ্গসংগঠনগুলোর বিস্তারিত অবস্থা
- জাতীয়তাবাদী যুবদল: ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আগে আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। দেড় বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়া সম্ভব হয়নি।
- স্বেচ্ছাসেবক দল: সভাপতি এসএম জিলানী এবং সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান দুজনই সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
- কৃষক দল: ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে গঠিত কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় দেড় বছর আগে।
- জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল: ২০২৪ সালের মার্চে গঠিত কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ফেব্রুয়ারিতে।
- মহিলা দল: ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে গঠিত কমিটি ১০ বছর ধরে চলছে।
- মুক্তিযোদ্ধা দল: ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে গঠিত কমিটি এক যুগের বেশি সময় ধরে রয়েছে।
- জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল: ২০১৪ সালের এপ্রিলে সর্বশেষ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
- মৎস্যজীবী দল: ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। এরপর আর কোনো কমিটি হয়নি।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এ বছর না হলে আগামী বছরের শুরুতে দলের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে পারে। এদিকে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন নিয়েও আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি তেজগাঁও কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন কার্যক্রম দ্রুত শুরু করার নির্দেশনা দেন।
সব মিলিয়ে, নির্বাচন সামনে রেখে মূল দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোকে নতুন নেতৃত্বে পুনর্গঠন করাই এখন বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
