বরিশাল সিটি করপোরেশনে প্রশাসক পদে বিএনপির এক ডজন নেতার তীব্র প্রতিযোগিতা
দেশের ৬টি সিটি করপোরেশনে দলীয় নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার পর বরিশাল সিটি করপোরেশনেও প্রশাসক পদ পাওয়ার জন্য শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বিএনপির এক ডজন নেতা এ প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। প্রশাসক পদ পেতে তারা চালাচ্ছেন জোরদার লবিং ও তদবির।
প্রশাসক নাকি নির্বাচন: অনিশ্চয়তা অব্যাহত
বরিশাল সিটি করপোরেশনে শেষ পর্যন্ত প্রশাসক নিযুক্ত হবে নাকি সরাসরি নির্বাচন হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছ থেকে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে প্রশাসক হতে চাওয়া নেতাদের লবিং তদবির চলছে পুরোদমে।
২০২৩ সালের নির্বাচনের পটভূমি
২০২৩ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেবার আওয়ামী লীগ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই খোকন আব্দুল্লাহকে মেয়র করে। দলে কোনো পদ-পদবি বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও শেখ পরিবারের কোটায় তিনি মেয়র হন। নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়েও ছিল নানা অভিযোগ।
মেয়র হলেও খুব বেশিদিন ক্ষমতার স্বাদ নিতে পারেননি শেখ পরিবারের এই সদস্য। শেখ হাসিনার পতনের সঙ্গে সঙ্গেই তাকে পালাতে হয়। বর্তমানে তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। হাসিনা সরকারের পতনের পর নগর পরিষদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং প্রশাসক পদে আসেন দায়িত্বরত বিভাগীয় কমিশনার। বর্তমানে এ দায়িত্বে আছেন বিভাগীয় কমিশনার মাহফুজুর রহমান।
বিএনপি সরকার ও প্রশাসক নিয়োগ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠন করেছে বিএনপি। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত মেয়রের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। পরে সেখানে হাইকোর্টের নির্দেশে মেয়র পদে বসেন ডা. শাহাদাত হোসেন।
এরই মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ ৬টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেয় সরকার। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দেরি হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। বরিশালেও প্রশাসক বসানো হতে পারে ভেবে মাঠে নামেন মেয়র পদে দলীয় মনোনয়নের প্রত্যাশায় থাকা নেতারা।
প্রতিযোগী নেতাদের তালিকা
বরিশালে আগে থেকেই মেয়র পদে মনোনয়নের আশায় কাজ করে যাচ্ছিলেন জেলা ও মহানগর বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা। প্রশাসক পদের আলোচনা শুরু হওয়ার পর এই তালিকায় যোগ হয়েছে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের আরও বেশ কয়েকজন নেতার নাম।
জাতীয় নির্বাচনে বরিশাল-৫ (সদর) আসনে বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন যারা:
- দলীয় চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল
- বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমতুল্লাহ
- এবায়েদুল হক চাঁন
- কেন্দ্রীয় বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন
- বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবুল কালাম শাহিন
- মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক
- যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা নাসরিন
এই ৭ জনই এখন আছেন প্রশাসক হওয়ার দৌড়ে। এমপির মনোনয়ন না চেয়ে শুরু থেকেই মেয়র পদের জন্য মাঠে থাকা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন সিকদারও আছেন এদের সঙ্গে লড়াইয়ে। পাশাপাশি মাঠে আছেন মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মীর জাহিদুল কবির এবং বিএনপি নেতা সাবেক প্যানেল মেয়র কেএম শহিদুল্লাহ। এছাড়াও প্রশাসক হওয়ার দৌড়ে আছেন যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা জাকির হোসেন নান্নুসহ কয়েকজন।
লবিং তদবিরের নানা দৃশ্য
প্রশাসক পদ পেতে আলোচ্য নেতাদের সবাই যে যার মতো চালাচ্ছেন লবিং তদবির। কয়েকজন তো স্থায়ী আসন গেড়ে বসে আছেন রাজধানীতে। ফুলের তোড়া আর ঝুড়ি নিয়ে ছুটছেন বিএনপির প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় নেতা আর সদ্য এমপি-মন্ত্রী হওয়া নেতাদের বাড়ি বাড়ি।
একদিকে এসবের ছবি তুলে ছাড়ছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, অন্যদিকে চলছে তাদের ম্যানেজের চেষ্টা। এসব দৌড়ঝাঁপের পাশাপাশি প্রশাসক নিয়োগ প্রশ্নে স্থানীয় নেতা কর্মীদেরও রয়েছে নানা দাবি।
স্থানীয় নেতাদের দাবি
বরিশাল মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কামরুল হাসান রতন বলেন, "আমরা চাই এমন একজনকে প্রশাসক কিংবা মেয়র পদে মনোনীত করা হোক যিনি এই মাটির সন্তান। সার্বক্ষণিকভাবে যিনি জড়িত স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে। মেয়র বা প্রশাসক পদটি যেহেতু মহানগরকেন্দ্রিক তাই মহানগরের রাজনীতি এবং নগরীর মানুষের সঙ্গে যাদের নিয়মিত ওঠা-বসা আছে তাদের মধ্য থেকেই কাউকে দেওয়া হোক এ দায়িত্ব।"
কেন্দ্রীয় নেতার বক্তব্য
পুরো বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল হক নান্নু বলেন, "কে কোথায় কী করছে বা দলের জন্য কার কী অবদান তা ভালো করেই জানেন প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দেশের ৬ সিটি করপোরেশনে যাদের প্রশাসক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তাদের রাজনৈতিক পরিচয় দেখলেই এটা পরিষ্কার বোঝা যায়। অতএব বরিশালেও এমন কাউকেই তিনি প্রশাসক বা মেয়র পদে মনোনয়ন দেবেন যিনি ত্যাগী পরীক্ষিত এবং যোগ্য নেতা। দলীয় চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তে কোনো ভুল হবে না।"
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে এ প্রতিযোগিতা কবে নিষ্পত্তি হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে দলীয় নেতাদের মধ্যে এ প্রতিযোগিতা স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
