বিএনপির নতুন মন্ত্রিসভায় বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করলেন সাতজন
বিএনপি মন্ত্রিসভায় বাবার পথে সাতজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী

বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করছেন নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলো সরকার গঠন করেছে। গত মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেছেন। এই মন্ত্রিসভায় একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, অন্তত সাতজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী তাদের বাবার দেখানো রাজনৈতিক পথ অনুসরণ করে এই পদে আসীন হয়েছেন। এছাড়া আরেকজনের বাবা ছিলেন সংসদ সদস্য, যা রাজনৈতিক বংশপরম্পরার একটি চিত্র তুলে ধরছে।

মানিকগঞ্জ-৩ আসনের আফরোজা খানম রিতা

প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েই মন্ত্রীত্বের দায়িত্ব পেয়েছেন মানিকগঞ্জ-৩ (সদর ও সাটুরিয়া) আসনের আফরোজা খানম রিতা। স্বাধীনতার পর এই আসনে তিনিই প্রথম নারী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন, যিনি ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩৪৫ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন। রিতা বর্তমানে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এবং জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তার বাবা প্রয়াত শিল্পপতি হারুনার রশিদ খান মুন্নু ছিলেন মানিকগঞ্জ-২ ও মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির চারবারের সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রীত্বের দায়িত্বও পালন করেছেন। রিতা এখন বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে নতুন মন্ত্রিসভায় অবস্থান করছেন।

নাটোর-১ আসনের ফারজানা শারমিন পুতুল

নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ফারজানা শারমিন পুতুল ১ লাখ ২ হাজার ১৯৭ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনিও প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। পুতুল প্রয়াত সাবেক প্রতিমন্ত্রী ফজলুর রহমান পটলের মেয়ে, যিনি নাটোর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক পদে রয়েছেন।

নতুন মন্ত্রিসভায় তাকে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, তার বাবা পটল সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও যুব ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।

যশোর-৩ আসনের অনিন্দ্য ইসলাম অমিত

যশোর-৩ (সদর) আসনে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনিও প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। অমিত বিএনপির একসময়ের স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং প্রয়াত মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের ছেলে।

তার বাবাও একই আসন থেকে কয়েকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করে অমিত এখন জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার বাবা তরিকুল ইসলাম বিএনপি সরকারে তথ্যমন্ত্রী ছিলেন।

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব

ঢাকা-৬ আসনের ইশরাক হোসেন: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে ২৩ হাজার ১৫৩ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী ইশরাক হোসেন। তিনি অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার ছেলে, যিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। খোকা নিজেও ঢাকার একাধিক আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভার মৎস্য ও পশু সম্পদ মন্ত্রী ছিলেন। ইশরাক নতুন মন্ত্রিসভায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন।

চট্টগ্রাম-৫ আসনের মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন: চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী ও নগরের আংশিক) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৪ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন। তার বাবা বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিসভায় বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। মীর হেলাল সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন।

ফরিদপুর-২ আসনের শামা ওবায়েদ ইসলাম: ফরিদপুর-২ (নগরকান্দা-সালথা) আসনে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী শামা ওবায়েদ ইসলাম ৩২ হাজার ৯৫৩ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন, মোট ভোট পেয়েছেন এক লাখ ২০ হাজার ৯০৯। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বিএনপির সাবেক মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত কেএম ওবায়দুর রহমানের মেয়ে। প্রথমবার নির্বাচিত হয়েই তিনি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন এবং বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক পদে রয়েছেন।

মানিকগঞ্জ-৯ আসনের ইয়াসের খান চৌধুরী: মানিকগঞ্জ-৯ আসন থেকে জয়ী হওয়া ইয়াসের খান চৌধুরী নতুন সরকারের প্রতিমন্ত্রীর তালিকায় রয়েছেন। তার বাবা মো. আনোয়ারুল হোসেন খান চৌধুরী ১৯৯১ সালের নির্বাচনে একই আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন এবং তার চাচা খুররম খান চৌধুরী ছিলেন চারবারের সংসদ সদস্য। ইয়াসের খান তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন।

সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের ডা. এম এ মুহিত: স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য ডা. এম এ মুহিত। তার বাবা চক্ষু বিশেষজ্ঞ মরহুম অধ্যাপক ডা. এম এ মতিন পাঁচবারের সংসদ সদস্য এবং জিয়াউর রহমান সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন। বাবার আসনে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েছেন ছেলে ডা. এম এ মুহিত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

এই নতুন মন্ত্রিসভায় বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে পারিবারিক উত্তরাধিকারের একটি সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই ব্যক্তিরা প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েই মন্ত্রীত্বের দায়িত্ব পেয়েছেন, যা তাদের রাজনৈতিক প্রভাব ও পারিবারিক ঐতিহ্যের ইঙ্গিত দেয়। বিএনপির এই নতুন সরকার গঠনে বংশপরম্পরায় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা দিয়েছে।