মামলা-হামলা পেরিয়ে প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম: বিএনপির রাজনীতির ৩০ বছর
মামলা-হামলা পেরিয়ে প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম

মামলা-হামলা পেরিয়ে প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম: বিএনপির রাজনীতির ৩০ বছর

কিশোরগঞ্জ-৬ (ভৈরব-কুলিয়ারচর) আসনে এবারের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন মো. শরীফুল আলম। বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছেন। এই নিয়োগে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার সূচনা হয়েছে।

৩০ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম

শরীফুল আলম ৩০ বছর ধরে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি একাধিকবার কারাবরণ, বিগত সরকারের অত্যাচার, মিথ্যা মামলা-হামলা এবং রিমান্ডে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বিগত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার তার বিরুদ্ধে মোট ৮৫টি মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে হয়রানি করেছে বলে তিনি দাবি করেন।

তার নির্বাচনি হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে, এখনও তার বিরুদ্ধে ঢাকার বিভিন্ন থানাসহ কিশোরগঞ্জ জেলায় ৭৩টি মিথ্যা মামলা চলমান আছে। সবগুলো মামলা রাজনৈতিক কারণে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হলে তৎকালীন সরকার তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দিতে থাকে।

নির্যাতন ও ভাঙচুরের অভিযোগ

ঢাকা ও কিশোরগঞ্জ আদালতে একাধিক মামলায় রিমান্ডে এনে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে বলে শরীফুল আলম জানান। তার বাড়ি-ঘর ভাঙচুর করা হয়েছে কয়েকবার। ভৈরব-কুলিয়ারচর বিএনপির অফিসও একাধিকবার ভাঙচুরের শিকার হয়েছে। এসব ঘটনা তার রাজনৈতিক সংগ্রামকে আরও তীব্র করেছে।

শরীফুল আলম বর্তমানে কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া তিনি কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ময়মনসিংহ বিভাগের সাংগঠনিক দায়িত্বেও রয়েছেন। তার নেতৃত্বে এবারের নির্বাচনে কিশোরগঞ্জের ৬টি আসনের মধ্যে ৫টি আসন বিএনপি পেয়েছে, যা দলীয় বিজয়ে তার অবদানকে তুলে ধরে।

নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানো

ভৈরব-কুলিয়ারচরসহ জেলার নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গত ১৫ বছরে যত রাজনৈতিক মিথ্যা মামলা হয়েছে, এসব মামলার তদারকি শরীফুল আলম করেছেন। মামলায় নেতাকর্মীরা যারা আসামি হয়েছে, তাদের জামিন, হাজিরা—সবকিছুতেই তিনি সহযোগিতা করেছেন। এমনকি দরিদ্র কর্মীদের বাসায় চাল পৌঁছে দিয়েছেন এবং কারাগারে থাকা কর্মীদের খোঁজ-খবর রেখেছেন।

কিশোরগঞ্জ-৬ আসনে স্বাধীনতার পর জিল্লুর রহমান ৬ বার ও তার ছেলে নাজমুল হাসান পাপন ৪ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। শরীফুল আলম দুজনের সঙ্গে ৫ বার মনোনয়ন পেলেও বিজয়ী হতে পারেননি। তিনি অভিযোগ করেন, বারবার তাকে ভোট ডাকাতি করে পরাজিত করা হয়েছে। এবার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তিনি জনগণের ভোটে বিজয়ী হন।

স্থানীয় নেতাদের প্রতিক্রিয়া

ভৈরব উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, "আমাদের নেতাকে জনগণ ভালোবাসে। তিনি গণমানুষের জন্য সবসময় কাজ করেন। নেতাকর্মীরা তাকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। বিগত দিনে তিনি নির্বাচন করলেও তাকে ভোট ডাকাতি করে পরাজিত করা হয়েছে। এবার বিজয়ের পর আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম তিনি মন্ত্রী হতে পারেন। সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে।"

কুলিয়ারচর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবদুল হান্নান বলেন, "শরীফুল আলম একজন সাদা মনের মানুষ। হিংসা, নিন্দা তার নেই। প্রতিহিংসা রাজনীতি তিনি কখনই করেন না। জেলার ১৩টি উপজেলায় তার সুনাম রয়েছে। দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে তিনি সবসময় চেষ্টা করেছেন। সফলও হয়েছেন তিনি। তাকে এবার প্রতিমন্ত্রী করায় দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।"

প্রতিমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া ও প্রতিশ্রুতি

প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম বলেন, "আমাকে মন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করায় আমি আমার নেতা তারেক রহমানের কাছে কৃতজ্ঞ। বিগত সরকারের আমলে আমার বিরুদ্ধে ৮৫টি মিথ্যা মামলা করা হয়েছে, যার ৭৩টি মামলা এখনও চলমান। রাজনৈতিক এসব মামলা দিয়ে আমাকে হয়রানি করা হয়েছে। গত ১৫ বছরে অনেক জুলুম, নির্যাতন, অত্যাচার সহ্য করেছি। বারবার জেলে গিয়েছি, আমাকে পুলিশ একাধিকবার রিমান্ডে এনে নির্যাতন করেছে।"

তিনি আরও যোগ করেন, "আমার অপরাধ ছিল কেন রাজনীতি করি এবং বারবার পাপনের বিরুদ্ধে প্রার্থী হই কেন। পাপন শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছিলেন। তাই হাসিনার প্রভাব খাটিয়ে আমাকে হয়রানি করা হয়েছে। এবার আল্লাহ সহায় হয়েছেন, পাপন দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। এখন এলাকার উন্নয়ন ও মানুষের সেবা করা হবে আমার কাজ।" তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতি করবেন না বলেও প্রতিশ্রুতি দেন।

শরীফুল আলমের এই নিয়োগ বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তার সংগ্রাম ও সাফল্য দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে।