ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি একটি বড় ধরনের জয় পেয়েছে, যা প্রায় ১৭ বছর পর সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খলভাবে অনুষ্ঠিত ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের আস্থা অর্জনের প্রতিফলন। এই নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস জয় কেবলমাত্র দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিতই দেয় না, বরং এটি ভারত, পাকিস্তান ও চীনজুড়ে আঞ্চলিক ক্ষমতার গতিশীলতা পুনর্নির্মাণের সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। নির্বাচন কমিশন শনিবার নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশ করেছে, যা নির্বাচন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিক সীলমোহর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নির্বাচনী ফলাফল ও বিশ্লেষণ
শুক্রবার নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, বিএনপি ও তার মিত্ররা ২৯৯টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২১২টি আসনে জয়লাভ করেছে। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ৭৭টি আসনে, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি আসনে এবং অন্যান্যরা ১টি আসনে জিতেছে। এই ফলাফলের মাধ্যমে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে এবং প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরছে।
প্রায় দুই দশকের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো সত্যিকারের প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্লেষকরা এই নির্বাচনকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতিতে একটি ‘দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তন’ শুরুর ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। ফলাফল ঘোষণার পরপরই প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন এই ফলাফলকে ‘ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গঠনের ক্ষেত্রে একটি নতুন মোড়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, নতুন সরকার স্পষ্ট লক্ষ্য ও কার্যকর বাস্তবায়ন কৌশলসহ একটি নীতি কাঠামো আনতে পারে। ভারত-পাকিস্তানের অব্যাহত বৈরিতা এবং চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোর পররাষ্ট্র নীতির গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হতে পারে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক মাধ্যমে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে পোস্ট করেছেন এবং ফোনে কথা বলেছেন। মোদি লিখেছেন, ভারত একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের সমর্থনে পাশে থাকবে। তবে নয়াদিল্লি ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল, যা হাসিনার দেশত্যাগের পর তলানিতে পৌঁছায়। জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী বলেন, বাংলাদেশের একটি নির্বাচিত সরকার ভারতের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্কে ফিরে যাওয়ার জন্য দৃঢ়ভাবে উৎসাহ পাবে, তবে শেখ হাসিনার আমলের সমীকরণ অনুসরণ করা উচিত হবে না।
পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন
যেখানে ভারত অনিশ্চয়তার মুখোমুখি, সেখানে পাকিস্তান একটি সুযোগ দেখছে। নোবেল জয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের অধীনে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় শুরু করেছে, উচ্চ পর্যায়ের সফর বিনিময় করেছে এবং ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপি সরকারের অধীনে এই গতি বৃদ্ধি পেতে পারে। পাকিস্তানের প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব সালমান বশির বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ‘দীর্ঘদিনের অস্থিরতার অবসান’ এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পুনরায় শুরু’ হওয়ার চিহ্ন বহন করছে।
চীনের সঙ্গে নতুন অধ্যায়
সম্ভবত বাংলাদেশ সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হবে চীনের সঙ্গে। বেইজিং শেখ হাসিনার সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলজুড়ে সংযোগ গড়ে তুলেছে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অবস্থান সম্প্রসারণ করেছে। শুক্রবার চীনা দূতাবাস বিএনপির বিজয়ে অভিনন্দন জানিয়েছে এবং নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তুতি প্রকাশ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেছেন, বিএনপি সম্ভবত চীনের সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও গভীর করবে, তবে বাংলাদেশকে চীনের বর্ধিত উপস্থিতির বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান আমেরিকান বিরোধিতার মুখোমুখি হতে পারে।
ঢাকার সূক্ষ্ম ভারসাম্যমূলক পদক্ষেপ
বিএনপির ইশতেহারে ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যেখানে জাতীয় সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য সব আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আহ্বান জানানো হয়েছে। বাস্তবতা হলো, একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে চীন, পাকিস্তান, মিয়ানমারসহ সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যা আসন্ন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক শাহাব এনাম খান বলেন, নতুন প্রশাসনকে তার কূটনীতি ‘বড় কথায় নয় বরং বাস্তববাদ’-এর ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ডন্থি বলেছেন, বাংলাদেশের রায় দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলকে পুনর্বিবেচনার সুযোগ দিয়েছে, তবে পররাষ্ট্র নীতি হঠাৎ পরিবর্তনের পরিবর্তে ধীরে ধীরে বিকশিত হয়।
