শিশু বয়সে টিকা নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা থাকলেও, বড় হওয়ার পর টিকা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অনেকেরই ধারণা কম। অনেকেই মনে করেন, ছোটবেলার টিকাই যথেষ্ট। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বদলায়, জীবনযাপন ও ঝুঁকিও পরিবর্তিত হয়। ফলে কিছু টিকার বুস্টার কিংবা নতুন করে টিকা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ টিকা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ১৮ বছরের পরও নিয়মিত টিকাদানের গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু টিকা শুধু নিজেকে নয়, পরিবার ও সমাজকেও সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে।
ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু টিকা
প্রতিবছর মৌসুমি ফ্লুতে বিশ্বজুড়ে বহু মানুষ অসুস্থ হন। বয়স্ক ব্যক্তি, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগে আক্রান্ত রোগী এবং গর্ভবতীদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। চিকিৎসকরা বলছেন, বছরে একবার ফ্লু টিকা নেওয়া সংক্রমণ ও জটিলতার ঝুঁকি কমায়। বিশেষ করে স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষক, গণপরিবহন বা জনসমাগমে কাজ করেন—এমন ব্যক্তিদের জন্য এই টিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
টিড্যাপ
শৈশবে নেওয়া টিকার সুরক্ষা সারাজীবন থাকে না। তাই চিকিৎসকরা নির্দিষ্ট সময় পর টিডি বা টিড্যাপ বুস্টার নেওয়ার পরামর্শ দেন। সাধারণত ১০ বছর পরপর এই টিকার বুস্টার নেওয়া নিরাপদ ধরা হয়। কাটা-ছেঁড়া, দুর্ঘটনা বা মরিচা ধরা ধাতব বস্তুর সংস্পর্শে এলে টিটেনাসের ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া হুপিং কাশি নবজাতকের জন্যও বিপজ্জনক হতে পারে।
হেপাটাইটিস বি
হেপাটাইটিস বি ভাইরাস লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। রক্ত, দূষিত সুচ বা শরীরের তরলের মাধ্যমে এই সংক্রমণ ছড়ায়। স্বাস্থ্যকর্মী, সেলুনকর্মী, নিয়মিত চিকিৎসাসেবা গ্রহণকারী ব্যক্তি কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেন—তাদের জন্য এই টিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এইচপিভি টিকা
হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) নারীদের জরায়ুমুখ ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া পুরুষদেরও কিছু ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে এই ভাইরাস জড়িত। চিকিৎসকরা বলছেন, নির্দিষ্ট বয়সসীমার মধ্যে এই টিকা নিলে ভবিষ্যতের বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো সম্ভব। অনেক দেশে কিশোর-কিশোরীদের পাশাপাশি তরুণ বয়সীদেরও এই টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
নিউমোকক্কাল
নিউমোকক্কাল টিকা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত। নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিস এবং রক্তে সংক্রমণ (সেপসিস)সহ নিউমোকক্কাস ব্যাকটেরিয়াজনিত গুরুতর রোগ থেকে সুরক্ষা দিতে এই টিকা কার্যকর ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তি, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্ট, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য এটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর মানুষদের ক্ষেত্রে নিউমোকক্কাল টিকা গুরুতর জটিলতা ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমাতে পারে।
টাইফয়েড টিকা
দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে ছড়ানো টাইফয়েড জ্বর এখনো বাংলাদেশসহ অনেক দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যঝুঁকি। সালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়াজনিত এই রোগ প্রতিরোধে টাইফয়েড টিকা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাসকারী প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও এই টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। নতুন কনজুগেট ভ্যাকসিন (টিসিভি) দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দিতে সক্ষম বলে চিকিৎসা মহলে গুরুত্ব পাচ্ছে।
শুধু শিশু নয়, প্রাপ্তবয়স্কদেরও সচেতনতা দরকার
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা শুধু শিশুদের বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, কর্মক্ষেত্র, দীর্ঘমেয়াদি রোগ কিংবা নতুন ভাইরাসের ঝুঁকির কারণে বড়দেরও টিকাদান পরিকল্পনা জানা প্রয়োজন। তবে কোন টিকা কার জন্য প্রয়োজন—তা বয়স, স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ও আগের টিকা নেওয়ার ইতিহাসের ওপর নির্ভর করে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই টিকা নেওয়া উচিত।



