নির্বাসন থেকে প্রধানমন্ত্রীর আসনে: তারেক রহমানের ঐতিহাসিক বিজয়
প্রায় দুই দশকের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে মাত্র দেড় মাসের মাথায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছেন। এক সময় যার ওপর কঠোর দমন-পীড়ন নেমে এসেছিল, সেই নেতা এখন দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে আসীন হতে যাচ্ছেন।
দীর্ঘ নির্বাসন ও প্রত্যাবর্তনের গল্প
২০০৮ সালে সেনাবাহিনী-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রেফতার ও কারাবন্দি অবস্থায় অমানবিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর চিকিৎসার প্রয়োজন দেখিয়ে দেশ ছাড়েন তারেক রহমান। প্রায় ১৬ বছর পর গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
ফেরার দিন ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হাজারো নেতাকর্মীর ভিড়ে এক নাটকীয় দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় তিনি মাকে হারান। তার মা বেগম খালেদা জিয়া, দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও দীর্ঘদিনের বিএনপি প্রধান, গত ৩০ ডিসেম্বর দীর্ঘ অসুস্থতার পর মৃত্যুবরণ করেন।
বিএনপির ইতিহাসের সর্ববৃহৎ বিজয়
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেসরকারি ফলাফলে বিএনপি পেয়েছে ২০০টির বেশি আসন, যা দলটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিজয়গুলোর একটি। ২০০১ সালে তারা পেয়েছিল ১৯৩টি আসন। এই বিজয় দলটির জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
এদিকে গণঅভ্যুত্থানের তরুণ নেতৃত্ব নিয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ১১ দলীয় জোট থেকে নির্ধারিত ৩০টি আসনের মধ্যে পেয়েছে মাত্র ছয়টি। রাস্তায় বিপুল উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও ভোটে তা রূপ দিতে পারেনি দলটি।
গণভোটে সংস্কারের প্রতি সমর্থন
জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত একটি সাংবিধানিক গণভোটে বিভিন্ন জরিপ ও স্থানীয় টিভির তথ্য অনুযায়ী হ্যাঁ ভোট ২০ লাখের বেশি আর না ভোট ৮ লাখ ৫০ হাজারের বেশি পাওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে। গণভোটের উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার
- দ্বিকক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ
- নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো
- বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আরও দৃঢ় করা
- প্রধানমন্ত্রীদের জন্য দুই মেয়াদে ১০ বছর সীমা
নীরব উদযাপন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
নির্বাচনে বিপুল জয়ের পরও বিএনপি কোনো বিজয় মিছিল বা শোভাযাত্রা না করার নির্দেশ দিয়েছে। দলের বিবৃতিতে বলা হয়, "জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে বিজয় সত্ত্বেও কোনো বিজয় মিছিল বা শোভাযাত্রা আয়োজন করা হবে না, বরং দেশের কল্যাণে জুমার নামাজ শেষে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হবে।"
তারেক রহমান এখন নিজেকে ‘রাজনৈতিক বংশধর’ হিসেবে নয়, বরং ‘গণতন্ত্র পুনর্গঠনের নেতৃত্ব’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেছেন, "বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নতির পথ কেবল গণতন্ত্র চর্চার মধ্য দিয়েই সম্ভব।"
তার পরিকল্পনায় রয়েছে পররাষ্ট্রনীতির পুনর্বিন্যাস, বিনিয়োগ বাড়ানো, দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারগুলোর জন্য সহায়তা বৃদ্ধি ও নতুন শিল্প গড়ে তোলা। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই তিনি পরিবর্তনের সংকেত দিচ্ছেন।
রাজনৈতিক বংশপরম্পরা ও নতুন প্রশ্ন
তারেক রহমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক বংশ পরম্পরার একটি প্রতীকী নাম। তার বাবা জিয়াউর রহমান ছিলেন ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ঘোষক ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং ১৯৭৭-১৯৮১ মেয়াদের রাষ্ট্রপতি। ১৯৮১ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তার মৃত্যু দেশকে আবারও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়।
তারেক রহমানের আকস্মিক উত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন প্রশ্নও তুলেছে। তরুণদের নেতৃত্বে যে পরিবর্তনের ঢেউ এসেছিল, তা ভোটবাক্সে প্রতিফলিত হয়নি। আবার, দুই দলের আধিপত্যের পরিচিত কাঠামোয় বিএনপির এই বিজয় অনেকের কাছে প্রত্যাবর্তন বলেই ধরা পড়ছে।
গণভোটের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার প্রতি জনসমর্থন স্পষ্ট হওয়ায় ২০২৪-২০২৫ সালের এই অধ্যায় ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রকে নতুন করে আঁকতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
