স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কাউকে জিতিয়ে আনা হবে না: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
স্থানীয় নির্বাচনে কাউকে জিতিয়ে আনা হবে না: প্রধানমন্ত্রী

বিএনপি ও এর তিন সহযোগী সংগঠন—যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন (কেআইবি) মিলনায়তনে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করা এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়েছেন তিনি। বিএনপি ও তিন সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, কাউকে ‘জিতিয়ে আনা’ হবে না। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। সেখানেই প্রধানমন্ত্রী ইঙ্গিত দেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে স্থানীয় সরকারের উপজেলা ও পৌরসভার নির্বাচন হতে পারে।

ক্ষমতায় আসার পর প্রথম বড় সাংগঠনিক সভা

ক্ষমতায় আসার আড়াই মাসের মাথায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও এর তিন সহযোগী সংগঠন—যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে শনিবার রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন (কেআইবি) মিলনায়তনে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বড় পরিসরে এটি ছিল বিএনপির প্রথম কোনো সাংগঠনিক মতবিনিময় সভা। যেখানে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, সব বিভাগীয় সাংগঠনিক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদক এবং জেলা ও মহানগর কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকেরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদল—এই তিন সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির পাঁচজন করে শীর্ষ নেতাকে মতবিনিময় সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়।

সভার সময় ও উপস্থিতি

মতবিনিময় সভা বেলা পৌনে ১১টায় শুরু হয়ে রাত প্রায় ৮টা পর্যন্ত চলে। মাঝখানে দুপুরের খাবার ও নামাজের বিরতি ছিল। রুদ্ধদ্বার এ সভায় ১১ জন মন্ত্রী বক্তব্য ও নেতাদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। বিএনপি ও তিন সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা ও মহানগর পর্যায়ের প্রায় এক হাজার নেতা মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রধানমন্ত্রীর কঠোর ও সুশাসনমুখী অবস্থান

মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন এমন একাধিক দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সভায় প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা—দুই ক্ষেত্রেই ‘কঠোর ও সুশাসনমুখী’ অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি মাঠপর্যায়ের নেতাদের ঐক্যবদ্ধ থাকা, ভালো আচরণ করে মানুষের মন জয় করতে সবার প্রতি আহ্বান জানান।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গ

শিগগিরই স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রয়াত বাবা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিশাল জানাজার কথা সামনে আনেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের মানুষ তাঁদের প্রতি যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন, তার প্রতিদান তাঁকে ও বিএনপিকে দিতে হবে। এর জন্য নেতা-কর্মীদের জনগণের পাশে থাকতে হবে। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তিনি কাউকে জিতিয়ে আনতে পারবেন না। মাঠে কাজ করে জনগণের আস্থা অর্জন করেই সবাইকে নির্বাচিত হয়ে আসতে হবে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মতো প্রশাসনিক প্রভাব বা দলীয় সুবিধা দিয়ে কাউকে জিতিয়ে আনা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।

উদ্বোধনী বক্তৃতায় ইশতেহার বাস্তবায়নের আহ্বান

এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উদ্বোধনী বক্তৃতা দেন। সেখানে তিনি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে দলের নেতা–কর্মীদের সহযোগিতা চেয়ে বলেন, দলের সমর্থন ও সমন্বয় ছাড়া সরকার সফল হতে পারবে না। তাই নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে করা সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে জন্য নতুন সংগ্রামে নামতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর অবস্থান

বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, এই মতবিনিময় সভার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে সরকারের মনোভাব। প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টাসহ মাঠপর্যায়ের নেতারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপের দাবি তোলেন। একজন নেতা জিয়াউর রহমানের সময়কার নিরাপত্তা পরিস্থিতির উদাহরণ টেনে বলেন, সে সময় মানুষ দরজা খুলে ঘুমাত। সে ধরনের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ আস্থার সঙ্গে বসবাস করতে পারে এবং সেটা এই পুলিশকে দিয়েই সম্ভব।

পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যেকোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনা হবে। এর জন্য যা যা করার করা হবে। এ ক্ষেত্রে কারও পরিচয় বিবেচনা করা হবে না। যার যার ভুলত্রুটি আছে, তাদের শুধরে নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলায় শিথিলতার ইঙ্গিত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অনেকে তাঁর কাছে অভিযোগ করেন, আইনশৃঙ্খলা সহজ করে দেওয়া হয়েছে কি না। তিনি বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন ও দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপটে কিছুটা শিথিলতা থাকলেও এখন থেকে কঠোরভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা হবে। সামনে আর সহজ করে দেখা হবে না, কঠিনভাবেই দেখা হবে। তাই নিজেদের মধ্যে বিভেদ কমিয়ে আনতে হবে।

মাঠপর্যায়ের নেতাদের প্রশ্ন ও মন্ত্রীদের উত্তর

জানা গেছে, মাঠপর্যায়ের নেতারা মন্ত্রীদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেন। যেমন শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনকে বলেছেন, এইচএসসি পরীক্ষা কেন এগিয়ে আনা হলো। এতে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে বলে কেউ কেউ মত প্রকাশ করেন। এক নেতা ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছেন, নির্বাচনের আগে প্রতিটি উপজেলায় মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের প্রতিশ্রুতি ছিল। এটি কোন পর্যায়ে আছে। এ ছাড়া এ পর্যন্ত ১৬৫ জন খেলোয়াড়কে ক্রীড়া কার্ড দেওয়া হয়েছে। এটা পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে কি না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেনের কাছে প্রশ্ন ছিল, কিছু হলেই রোগীদের ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্য চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না। এ ছাড়া নেতাদের অনেকে রেল, রাস্তাঘাট, সেতুসহ নানা পর্যায়ে স্থানীয় সমস্যার কথা তুলে ধরেন। প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রীরা সমস্যা সমাধানে নেতাদের আশ্বস্ত করেন।

মির্জা ফখরুলের বক্তব্য

মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, দেশকে ধ্বংসস্তূপ থেকে টেনে তুলে পুনর্গঠন করাই এখন বিএনপি সরকারের নতুন চ্যালেঞ্জ। এখন যে কাজগুলো হচ্ছে, সেগুলো তৃণমূল পর্যায়ে সব মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নেতা–কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

সভার সভাপতিত্ব ও উপস্থিতি

বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান, সেলিমা রহমান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু প্রমুখ।

মতবিনিময় সভার মূল বার্তা

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বৈঠকে উপস্থিত থাকা বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, এই মতবিনিময় সভার মূল বার্তা হচ্ছে, দল ও সরকারের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা। উপজেলা ও পৌরসভার নির্বাচনে মানুষের ভালোবাসা অর্জনে এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে এবং নেতা-কর্মীদের বিভেদ মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। প্রতি তিন–চার মাস অন্তর মন্ত্রী ও মাঠপর্যায়ের নেতদের নিয়ে এ ধরনের মতবিনিময় সভা করা হবে। যাতে মন্ত্রীদের জবাবদিহির পাশাপাশি সরকারের নেওয়া জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ এবং পরিকল্পনাগুলো মাঠপর্যায়ে পৌঁছায়।