দেড় দশক পর বিএনপির বড় পুনর্গঠন, ডিসেম্বরে কাউন্সিলের প্রস্তুতি
দেড় দশক পর বিএনপির বড় পুনর্গঠন, ডিসেম্বরে কাউন্সিল

দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও গত এক দশকে রাজনৈতিক চাপ, দমন-পীড়ন এবং দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেনি। একই পরিস্থিতি দেখা গেছে দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোতেও। ফলে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা সাংগঠনিক শৃঙ্খলাকে দুর্বল করেছে।

এই দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা কাটাতে বড় ধরনের পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে দলটি। বিএনপি জানিয়েছে, আগামী ডিসেম্বরে জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। এর আগে ধাপে ধাপে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোতে নতুন কমিটি গঠন করা হবে।

রাজনৈতিক সাফল্যের পর পুনর্গঠনের উদ্যোগ

দেড় দশকের বেশি সময় পর চলতি বছর বড় রাজনৈতিক সাফল্য পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। এবার দলীয় কার্যক্রমে গতি আনতে আগামী কাউন্সিলে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কাঠামোতেও বড় পরিবর্তনের আভাস মিলছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দলীয় সূত্র জানায়, সরকার গঠনের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দল পুনর্গঠনে জোর দিয়েছেন। ‘অল-আউট রিসেট’ নামে একটি পরিকল্পনার আওতায় বিএনপিকে পুনর্গঠনের চিন্তা চলছে। এই উদ্যোগে তুলনামূলক তরুণ, সক্রিয় ও মাঠমুখী নেতাদের কেন্দ্রীয় কমিটি ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে—যা নেতৃত্বে প্রজন্মগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

একইসঙ্গে অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ নেতাদের পুরোপুরি সরিয়ে না দিয়ে উপদেষ্টা হিসেবে রাখার ভাবনা রয়েছে, যাতে অভিজ্ঞতা ও নতুন নেতৃত্বের মধ্যে ভারসাম্য থাকে। নিষ্ক্রিয় নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কাউন্সিলকে পুনরুজ্জীবনের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে

দলীয় একাধিক সূত্র বলছে, এই কাউন্সিলকে নিয়মিত আয়োজন হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং এটি একটি বড় সাংগঠনিক পুনরুজ্জীবনের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব সংকট, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি এবং দুর্বল তৃণমূল কাঠামো কাটিয়ে ওঠার সুযোগ হিসেবে কাউন্সিলকে কাজে লাগাতে চায় দলটি।

তৃণমূল থেকে নতুন নেতৃত্ব তুলে আনার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে—বিশেষ করে যারা আন্দোলন, কর্মসূচি ও মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে স্থানীয় ইউনিটগুলোর যোগাযোগ জোরদার করাও অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

নেতাদের বক্তব্য

কাউন্সিল প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘সরকার পরিচালনার দায়িত্ব বেড়েছে। এখন আমাদের অগ্রাধিকার হবে সাংগঠনিক পুনর্গঠন। শিগগিরই এ বিষয়ে কাজ শুরু হবে।’

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বিরোধী দলে থাকাকালে নেতাকর্মীরা আন্দোলনে ব্যস্ত থাকায় গত এক দশকে নিয়মিত কাউন্সিল করা সম্ভব হয়নি। তবে ডিসেম্বরে নির্ধারিত কাউন্সিলের প্রস্তুতি এখন পুরোদমে চলছে।’

সর্বশেষ কাউন্সিল ও বর্তমান কমিটির অবস্থা

উল্লেখ্য, বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। ওই কাউন্সিলে বেগম খালেদা জিয়া বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারপারসন এবং তারেক রহমান সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। সাংগঠনিক শৃঙ্খলা জোরদারে ‘এক নেতা, এক পদ’ নীতিও গৃহীত হয়।

ওই কাউন্সিলের পর ৩০ মার্চ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা হয়। এর আগে ২০১১ সালে খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয়েছিল।

দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সংখ্যা ১৯। তবে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক পদ শূন্য রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর মারা যাওয়ার পর তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থেকে পূর্ণ চেয়ারম্যান হন।

সবশেষ কাউন্সিলের পর স্থায়ী কমিটির দুটি পদ শূন্য ছিল। পরে এম তারিকুল ইসলাম, এএসএম হান্নান শাহ ও এম কে আনোয়ারের মৃত্যুর পর মোট পাঁচটি পদ শূন্য হয়। ২০১৯ সালের ১৯ জুন সেলিমা রহমান ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরে গণঅভ্যুত্থানের পর মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও ড. এজেডএম জাহিদ হোসেন যুক্ত হন। বর্তমানে হাফিজ উদ্দিন আহমেদ সংসদের স্পিকার হওয়ায় তার দলীয় পদ আবার শূন্য হয়েছে। এখন কমিটিতে সদস্য রয়েছেন ১৫ জন; এর মধ্যে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ও ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া অসুস্থতার কারণে নিষ্ক্রিয়।

কেন্দ্রীয় কমিটিতে বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা পরিষদ ও কেন্দ্রীয় কমিটিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের চিন্তা চলছে। নিষ্ক্রিয় বা কম সক্রিয় নেতাদের জায়গায় মাঠে সক্রিয়, সাংগঠনিকভাবে দক্ষ ও রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্যদের আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রতিটি বিভাগে গতিশীল নেতৃত্ব বসিয়ে আঞ্চলিক সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করার কৌশলও নেওয়া হচ্ছে। আন্দোলনে সক্রিয়, তৃণমূলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং ধারাবাহিক সাংগঠনিক কাজ করা নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

স্থায়ী কমিটির বেশ কয়েকজন সদস্য বয়স ও শারীরিক কারণে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। এ প্রেক্ষাপটে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কমিটিকে আরও কার্যকর ও গতিশীল করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সম্ভাব্য নতুন নাম

সম্ভাব্য নতুন নাম হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন—আবদুল আউয়াল মিন্টু, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন কায়কোবাদ, রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী অ্যানি, খন্দকার আব্দ আল মুকতাদির, আহমেদ আজম খান ও জহির উদ্দিন মাহমুদ স্বপন।

মহাসচিব পদে পরিবর্তনের সম্ভাবনা

এদিকে, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করলেও বয়স ও শারীরিক কারণে নেতৃত্বে পরিবর্তনের আলোচনা চলছে। তিনি নিজেও রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। ফলে তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়েও আলোচনা জোরদার হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকার পরিচালনা ও দলীয় সংগঠন—দুই ক্ষেত্রেই দক্ষ এমন কাউকে বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন—স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এবং যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল ও শহীদ উদ্দিন চৌধুরী অ্যানি।

অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন পুনর্গঠন

কাউন্সিলের আগে সাংগঠনিক কমিটি পুনর্গঠন সপ্তম জাতীয় কাউন্সিলকে সামনে রেখে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলতে তৎপরতা বাড়িয়েছে বিএনপি। অধিকাংশ সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে।

জাতীয়তাবাদী যুবদলে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আব্দুল মঈন মুন্নাকে সভাপতি ও নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে আংশিক কমিটি গঠন করা হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি এখনো হয়নি। কোরবানির ঈদের পর নতুন কমিটি আসতে পারে।

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ গত মার্চে শেষ হয়েছে। নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চললেও এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এখানেও ঈদের পর সিদ্ধান্ত আসতে পারে। আর জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল বর্তমানে ২০২২ সালে গঠিত পাঁচ সদস্যের আংশিক কমিটি দিয়ে চলছে। এর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দুজনই সংসদ সদস্য হওয়ায় সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।

একই চিত্র জাতীয়তাবাদী মহিলা দলসহ অন্যান্য সংগঠনেও। ২০১৬ সালে গঠিত কমিটি দিয়েই এখনও কার্যক্রম চলছে। শ্রমিক দল, তাঁতী দল ও জাসাসেও দীর্ঘদিন ধরে পুরনো ও নিষ্ক্রিয় কমিটি বহাল রয়েছে। এসব সংগঠনে শিগগির নেতৃত্বে পরিবর্তন আসতে পারে।

এ বিষয়ে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, ‘আমরা নিয়মিত সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি এবং তৃণমূলে শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তুলতে কাজ করছি। দল নির্দেশ দিলে নতুন কমিটি গঠন করা হবে।’