যশোরের শার্শা উপজেলায় পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে জখম করার মামলার প্রধান আসামি উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোস্তফা কামাল মিন্টুকে গ্রেফতার করতে গিয়ে মবের শিকার হয়েছে পুলিশ। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে স্থানীয়দের জড়ো করে মিন্টুকে পুলিশের কবল থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ
বৃহস্পতিবার বিকালে শার্শা উপজেলার শ্যামলাগাছি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। শার্শা থানার ওসি মারুফ হোসেনের নেতৃত্বে থানা ও ডিবি পুলিশের যৌথ টিম মিন্টুকে গ্রেফতার করতে তার বাড়ির সামনে থেকে তাকে আটক করে। এ সময় মিন্টুর সমর্থকরা গ্রামের একাধিক মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে এলাকাবাসীকে প্রতিরোধের আহ্বান জানান। মাইকের ঘোষণা শুনে কয়েকশ নারী-পুরুষ সেখানে জড়ো হয়ে পুলিশ সদস্যদের ঘিরে ফেলেন এবং মব সৃষ্টি করে মিন্টুকে ছিনিয়ে নেন। একপর্যায়ে পুলিশ ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য
এলাকার একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, গ্রামের মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয় মোস্তফা কামাল মিন্টুকে পুলিশ ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তুলে নিয়ে যাচ্ছে এবং তাকে মুক্ত করতে গ্রামবাসীকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়। তখন মাইকের ঘোষণা শুনে কয়েকশ নারী-পুরুষ জড়ো হন এবং পুলিশকে ঘিরে ফেলেন। গ্রেফতার করলেও জনরোষে মিন্টুকে রেখেই পুলিশ চলে যায়।
মিন্টুর সমর্থকদের দাবি
মিন্টুর সমর্থকদের দাবি, পুলিশের মারপিটের ঘটনায় মিন্টু জড়িত নয়। তাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। পুলিশ কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অবৈধভাবে মিন্টুকে গ্রেফতার করতে এসেছিল এবং এলাকাবাসী পুলিশের অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রতিহত করেছেন।
মামলার প্রেক্ষাপট
পুলিশ সদস্য মামুন হাসান ওরফে জুয়েল, যিনি বর্তমানে টুরিস্ট পুলিশের হেডকোয়ার্টারে নায়েক পদে কর্মরত, কুরবানির ঈদে ছুটিতে গ্রামে বেড়াতে এসে হামলার শিকার হন। এ ঘটনায় তার ছোটভাই মেহেদী হাসান রয়েল গত ৪ জুন শার্শা থানায় ৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ৫-৬ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। ওই মামলার প্রধান আসামি শার্শা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও শ্যামলাগাছি গ্রামের আবদুল মজিদের ছেলে অ্যাডভোকেট মোস্তফা কামাল মিন্টু। অপর আসামিরা হলেন মিন্টুর ভাই লাল্টু হোসেন ও পিন্টু হোসেন, আবদুস সালামের ছেলে সুজন হোসেন ও সবুজ হোসেন এবং আলাউদ্দিনের ছেলে টিটন হোসেন।
এজাহারের বিবরণ
এজাহারে বাদী উল্লেখ করেছেন, গত ২৯ মে বিকাল সোয়া ৪টার দিকে পুলিশ সদস্য মামুন হাসান মোটরসাইকেলযোগে বাড়ি থেকে শার্শা বাজারে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে শ্যামলাগাছি গ্রামের জনৈক হাবিবের চায়ের দোকানের সামনে পৌঁছলে আসামিরা পূর্বশত্রুতার জের ধরে তার গতিরোধ করে এবং দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে তাকে বেধড়ক মারপিট করে জখম করে।
পরিবারের অভিযোগ
পুলিশ সদস্য হাসান মামুন কর্মস্থলে থাকলেও তার পরিবারের সদস্যদের নানাভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আসামিদের ভয়ে পরিবারের সদস্যরা গ্রামের বাড়িতে থাকতে পারছেন না। শুক্রবার দুপুরে হাসান মামুনদের বাড়িতে গিয়ে তার ভাই ও পিতাসহ পরিবারের সদস্যদের পাওয়া যায়নি। তার ছোট চাচা সফিয়ার রহমান বাড়ির প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে আছেন। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন।
সফিয়ার রহমানের বক্তব্য
শফিয়ার রহমান বলেন, তার ভাইয়ের (মামুন হাসানের পিতা) বালির ব্যবসা ছিল এবং প্রায় ১৫ লাখ টাকা মূল্যের উত্তোলন করা বালু আছে। ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর সেই বালু বিক্রি কিংবা সরিয়ে নিতে দেয়নি আসামিরা। তারা ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিল; কিন্তু শেষপর্যন্ত দুই লাখ টাকা দিতে রাজি হলেও বালু বিক্রি করতে দেয়নি। এ কারণে তারা তার ভাইয়ের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। তিনি আরও বলেন, কুরবানির ঈদে বাড়িতে এসে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যান ভাইপো হাসান মামুন। সেখানে শার্শা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লিটনের সঙ্গে তার দেখা হলে বালু বিক্রিতে বাধা দেওয়ার বিষয়টি অবহিত করেন। এ সময় তার পাশে থাকা কেউ মিন্টুকে জানিয়ে দেয় যে কেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের কাছে অভিযোগ দিল। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে আসামিরা ভাইপোকে বেধড়ক মারপিট করে। পুলিশ মিন্টুকে গ্রেফতার করতে আসায় আসামিরা তাদের ওপর চরম ক্ষুব্ধ এবং তারা সবাই আতঙ্কে আছেন, বাড়িতে ঘুমাতে পারছেন না।
অভিযুক্ত বিএনপি নেতার বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শার্শা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা কামাল মিন্টু বলেন, পুলিশ সদস্যকে মারপিটের ঘটনায় তিনি জড়িত নন এবং ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাকে ফাঁসানো হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে মামলা নেই এবং ওয়ারেন্ট ছাড়াই শার্শা থানার ওসি জোরপূর্বক তাকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় এলাকাবাসী জড়ো হয়ে তাকে মুক্ত করেছেন। সুনির্দিষ্ট মামলা ও ওয়ারেন্ট ছাড়া পুলিশের এমন আচরণ অপেশাদার বলে তিনি মন্তব্য করেন এবং দাবি করেন পুলিশ টাকা খেয়ে প্রভাবিত হয়ে তাকে গ্রেফতার করতে এসেছিল। তিনি আরও দাবি করেন, ওই পুলিশ সদস্য ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন এবং আওয়ামী লীগের আমলে দাপট দেখিয়ে এলাকার মানুষকে নির্যাতন করেছে, ফলে নির্যাতিতদের কেউ কেউ তাকে কিলঘুসি মেরেছে।
পুলিশের বক্তব্য
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শার্শা থানার ওসি মারুফ হোসেন বলেন, পুলিশ সদস্যকে মারপিটের ঘটনায় ছয়জনের নাম উল্লেখসহ মামলা হয়েছে এবং ওই মামলার প্রধান আসামি মোস্তফা কামাল মিন্টু। তাকে গ্রেফতারের সময় মব সৃষ্টি করে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।



