সরকারের ভালো কাজে সহযোগিতা এবং ভুল দেখলে বিরোধিতা করার কথা উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের সব অপরাধের বিচার দাবি করেছেন। বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অপরাধের বিচার দাবি
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “ফ্যাসিস্ট আমলে যতগুলো অপরাধ সংঘঠিত হয়েছে, যতগুলো খুন-গুম হয়েছে, যত জায়গায় মানবতা লঙ্ঘিত হয়েছে, ধর্ষণ হয়েছে— এই প্রতিটি অপরাধের বিচার করতে হবে। সেই বিচার ওসমান হাদি পর্যন্ত আসতে হবে। কিন্তু বিচারের দিকে তাকিয়ে আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না বিচারের অঙ্গনে কী সবুজ পতাকা উঠছে না লাল পতাকা উঠছে না কালো পতাকা উঠছে? বুঝতে পারছি না। আমরা একটা সবুজ পতাকা দেখতে চাই।”
জাতিকে হতাশ না করার অঙ্গীকার
শফিকুর রহমান বলেন, “জাতিকে আমরা হতাশ করবো না। জাতির প্রত্যাশার আলোকে মজলুমের পাওনা তার কাছে পৌঁছে দেবো। না হলে শহীদদের আত্মা, তাদের আপনজন গুমের শিকার লোকগুলো তাদের আপনজন ধর্ষণের শিকার হয়ে যে কেটেছে যার চোখের পানিতে হয়তো একটা নালা নদী তৈরি হয়ে গেছে, তাদের আত্মার অভিশাপের ভার পার্লামেন্টের বহন করা ঠিক হবে না।”
সংবিধান প্রসঙ্গে বক্তব্য
তিনি আরও বলেন, “আমাদের অনেক বন্ধু একাত্তরের সংবিধান সম্পর্কে তাদের হোল হার্টেড রেসপেক্ট পে করেন। আমি পারি নাই। যারা করেন তারা এখন সরকারি ট্রেজারি বেঞ্চে অনেকে বসে আছেন। আপনিও পারেন না, কারণ ৭২-এর সংবিধানকে পরিবর্তন করে দিয়ে গেছেন মরহুম প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমান। যে জায়গাগুলা তার দৃষ্টিতে সংস্কার-মেরামতের দরকার ছিল— তিনি করেছেন। তাইলে এখন কীভাবে আমরা বলতে পারি যে, আমরা ৭২-এর সংবিধান চাই।”
শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা বলতে পারি আমাদেরকে এমনভাবে বলা হয় আমরা যেন সংবিধানই মানি না। সংবিধান না মানলে এখানে আসলাম কেমনে? এই দেশে বসবাস করি কেন? যত সময় পর্যন্ত দেশে বিদ্যমান সংবিধান আছে আমরা তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করবো, পরিবর্তনের জন্য বিদ্রোহ করবো— একজন নাগরিক হিসেবে এটাই আমার দায়িত্ব। আমি আমার দাবি অব্যাহতভাবে জানিয়ে যাবো— যতক্ষণ পর্যন্ত আমার দাবি বাস্তবায়ন না হবে। তবে হ্যাঁ, আমার দাবিটা যদি যৌক্তিক না হয়, তাহলে এটাকে আমি যেকোনও সময় অ্যাবানডন ঘোষণা করতে পারি তাতেও কোন সমস্যা নেই।”
দখলবাজি ও আইনশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে
শফিকুর রহমান বলেন, “দখলবাজি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় কতগুলা মূল্যবান জীবন ধরে গেছে। আমি তাদের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছি। তারা তো এদেশেরই সন্তান। এভাবেই মরতে হবে কেন? হালাল রুজির ৯৯ ভাগ মানুষের জন্য থাকলে এই এক পারসেন্ট মানুষের হাতে কেন ৯৯ ভাগ মানুষ জিম্মি হবে— এদের যন্ত্রণা থেকে দেশটাকে মুক্ত করতে হবে।”
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি-উন্নতি আমি এগুলা বুঝি না— যে সরকার আসে এসেই বলে যে আগের চেয়ে এখন অবস্থা ভালো, আগেরটা কী সেটাও বুঝি। বর্তমানে আমরা একটা নিরাপদ বাংলাদেশে বসবাস করতে চাই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো বাংলাদেশের সব জায়গার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি একই ধরনের। কিন্তু যে জায়গাটা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বেশি ভালনারেবল সেই জায়গায় যেন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আগেই নজর দেওয়া হয়।”
শিক্ষাঙ্গনে নিরাপত্তা ও গবেষণার গুরুত্ব
শিক্ষাঙ্গনে নিরাপত্তা দাবি করে শফিকুর রহমান বলেন, “শিক্ষাঙ্গনগুলোকে সব ধরনের সন্ত্রাসমুক্ত যেন রাখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা হয়। আমরা আর দেখতে চাই না যে দলেরই হোক দায়ের কোপে কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র কারও জীবন নিয়ে গেছে— এটা দেখতে চাই না। আমরা দেখতে চাই শিশু হয়ে ঢুকবে, পরিণত মানুষ হয়ে ওখান থেকে বের হবে। দক্ষ নাগরিক হয়ে বের হবে। নৈতিকতাবোধ সম্পন্ন নাগরিক হয়ে বের হবে। দেশপ্রেম বুকে নিয়ে বের হবে। দেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে বের হবে। আমরা সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেখতে চাই। দেশকে যদি আগাতে হয় তাহলে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য এই দুইকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার প্রাণ হচ্ছে টারশিয়ালি লেভেলে সেখানে রিসার্চ হবে। জাতির ভবিষ্যৎ ওখান থেকেই বের হয়ে আসবে। দুঃখের বিষয় গবেষণায় ফকিরের ভিক্ষা দেওয়া হয়।”
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি
বিরোধীদলীয় নেতা তিস্তা মহাপরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে বলেন, “তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের গল্প শুনতে শুনতে মানুষগুলা ক্লান্ত। এখন আর গল্প শুনতে চায় না। এখন তারা পদক্ষেপ দেখতে চায়। আমরা নির্বাচনের সময় কথা দিয়েছিলাম— সরকারে কে আসবে না আসবে আল্লাহতা’লা নির্ধারণ করবেন। আমরা যদি সেই সুযোগ পাই আমাদের প্রথম পদক্ষেপ হবে তিস্তা নদীতে প্রথম কোদালটা ধরলে আমরা এখান থেকে শুরু করবো। সারা বাংলাদেশ কমবেশি ঘোরার সুযোগ হয়েছে— রিয়েলি, তিস্তাপারের মানুষগুলোর মতো এত দুর্ভাগ্যপীড়িত মানুষ আমি বাংলাদেশের কোথাও আর দেখিনি। অবশ্যই আমাকে তাদের কথা বলতে হবে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন অতিসত্ত্বর বিশ্বাসযোগ্য দৃশ্যমান ভূমিকা নেওয়া হচ্ছে। আমরা দেখতে চাই কারও চোখ রাঙানিকে আমরা পরোয়া করবো না। আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহতা’লা ৪০ কোটি হাত দিয়েছেন, প্রতিটি হাত সরকারের পাশে দাঁড়াবে। সরকার যদি সাহস করে, এই পদক্ষেপে আমি দাঁড়াবো সবার আগে।”



