রাজনীতির মূল চালিকা শক্তি জনগণের উপলব্ধি, সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়: সংস্কার নিয়ে বিএনপির দ্বিধা
রাজনীতির মূল চালিকা জনগণের উপলব্ধি, সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়

রাজনীতির মূল চালিকা শক্তি জনগণের উপলব্ধি, সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়

রাজনীতি শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা ক্ষমতার খেলা নয়; এর মূল চালিকা শক্তি হলো জনগণের উপলব্ধি ও আকাঙ্ক্ষা। রাজনীতিবিদেরা যদি জনগণের চাহিদাকে সার্বক্ষণিক বুঝতে না পারেন, তাহলে তাদের ক্ষমতা ও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। কিছু দেশে গণতান্ত্রিক ভিত্তি শক্তিশালী, যেখানে দলগুলো নির্বাচনের মাধ্যমে জবাবদিহি করে। কিন্তু বাংলাদেশে অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশে জনগণ দ্রুত ফলাফল আশা করে এবং সিদ্ধান্ত পাল্টায়। সরকারি দল যদি জনগণের সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বিপদে পড়তে পারে।

সংস্কার নিয়ে বিএনপির দ্বিধা ও জনগণের প্রত্যাশা

দেশের হাজারো সমস্যার মধ্যে জনগণ আশা করেছিল, সংসদ বসলে সংস্কার ও সনদ নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। দেড় বছর ধরে তারা শুনছে বিচার বিভাগ স্বাধীন হবে, গুম-খুন বন্ধ হবে, এবং মৌলিক অধিকার রক্ষায় কমিশন গঠিত হবে। কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এখনো অনিশ্চিত। বিএনপি বলছে সবই হবে, কিন্তু তাদের আরও চিন্তাভাবনা প্রয়োজন। এ যেন ‘গাধার নাকের ডগায় মুলা ঝুলিয়ে’ অগ্রসর হওয়া, যেখানে শেষে গাধা ক্লান্ত হবে এবং মুলা পচে যাবে।

নির্বাচন ও সংসদ গঠনের মূল উদ্দেশ্য হলো সমস্যাগুলো সংসদে আলোচনা করে সমাধান করা। কিন্তু বর্তমান সংসদে রীতিনীতির অভাব দেখা যাচ্ছে। সরকারি দল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে, আর বিরোধী দল প্রতিদিন জুলাইয়ের হুমকি দিচ্ছে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জনগণের সন্দেহ ও সরকারি দলের চ্যালেঞ্জ

বিএনপিকে বুঝতে হবে, বাংলাদেশের জনগণ সরকারি দলকে সন্দেহের চোখে দেখে। যেকোনো রাজনৈতিক বিতণ্ডায় জনগণের সহানুভূতি বিরোধী দলের দিকে থাকে। কারণ, সরকার গঠনকারী দল দেশের সব সমস্যার মালিক হয়ে যায়—চাকরি, তেল, বিদ্যুতের সংকট থেকে শুরু করে সংস্কারের অভাব সবই সরকারের দোষ হিসেবে গণ্য হয়। জাতীয় বিতর্কে সরকারি দল আত্মরক্ষামূলক অবস্থান নিলে জনগণ বিরোধী দলকে সমর্থন করে।

এ থেকে রক্ষা পেতে বিএনপির দুটি উপায় আছে: জনগণের চাওয়া অনুযায়ী সংস্কার কাজে অগ্রাধিকার দেওয়া অথবা ‘পালিত বিরোধী দল’ তৈরি করা। বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্বিতীয়টি সম্ভব নয় বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচন শেষে জামায়াতের সমালোচিত বিষয়গুলো, যেমন একাত্তরের ভূমিকা বা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, এখন আলোচনায় নেই। বরং সংস্কার, গুম বন্ধ, এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ইস্যুভিত্তিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতামত ও বিএনপির ভুল কৌশল

সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, সাংবাদিক সোহরাব হাসান, এবং অধিকারকর্মী শহিদুল আলমের মতো ব্যক্তিরা সংখ্যাগরিষ্ঠতার অপব্যবহার ও ব্যবস্থার পরিবর্তনের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। টিআইবির পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান খোলাখুলি বলেছেন, বিএনপি সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন, এবং গুম প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পেছনে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিএনপিকে সংস্কারের গুরুত্ব বুঝতে হবে। বাংলাদেশের বিচার বিভাগ কতদিন শাসক দলের হাতিয়ার হয়ে কাজ করবে? শুধু মুখে বললে চলবে না, কাজকর্মে সংস্কারের অগ্রাধিকার বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে। অনেকেই মনে করছেন, বিএনপি সংস্কারের অগ্রাধিকারযোগ্য বিষয়গুলো কার্পেটের তলায় ধামাচাপা দিচ্ছে, যা জনগণের সন্দেহ ও সুশীল সমাজের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

বিএনপি একসময় জুলাই সনদে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল এবং সংস্কারের প্রয়োজন স্বীকার করেছিল। তারা গণভোটের ‘হ্যাঁ’ ভোটকেও সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের পর জামায়াতকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তারা বড় ভুল করছে। এখন এটি শুধু সংস্কারের প্রশ্ন নয়, বরং বিএনপির জন্য রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সংস্কার নিয়ে বিতণ্ডা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

ইউনূস সরকারের সনদ প্রক্রিয়া ও গণভোট নিয়েও প্রশ্ন আছে। সনদে সবার সম্মতি ছিল না, জামায়াত ও বিএনপি উভয়েই ডিসেন্ট দিয়েছে। ডিসেন্টগুলো অগ্রাহ্য করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়া একটি বাজে সিদ্ধান্ত ছিল। বিএনপির কৌশলগত ভুল এখন তাদের জন্য চাপ সৃষ্টি করছে।

এনসিপি নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেছেন, গণভোটের রায় না মানলে সরকারকে অবৈধ বলা হবে, এবং আন্দোলন শুরু হতে পারে। বাংলাদেশে আন্দোলনের চক্র কতকাল চলবে? সংবিধানবিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিকের মতে, স্বৈরশাসনের দোষ সংবিধানের নয়, অপব্যবহারকারীদের। কিন্তু বিএনপি এই যুক্তি দিয়ে সংস্কার এড়াতে পারবে না, কারণ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নেতারা ও তরুণরা সব দোষ সংবিধানের বলে মনে করেন।

সংস্কার নিয়ে বিতণ্ডা সম্প্রসারিত হওয়ার আগে বিএনপিকে নতুন করে ভাবতে হবে। মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন, গুম প্রতিরোধ, এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো সহজবোধ্য সংস্কারগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কালক্ষেপণ না করে আইনে রূপ দিয়ে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থাকলে বিএনপির নেতা-কর্মীদের জেল-জুলুম কম হতো, এবং শেখ হাসিনার নির্বাচনগুলোও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ত।

সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক