আগাম্বেনের দর্শনে জুলাই অভ্যুত্থান: পরিচয়হীন জনতার শক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের চ্যালেঞ্জ
আগাম্বেনের দর্শনে জুলাই অভ্যুত্থান: পরিচয়হীন জনতার শক্তি

ইতালির দার্শনিক জর্জিও আগাম্বেনের ‘কামিং কমিউনিটি’ বইয়ের তত্ত্ব দিয়ে ২০২৪ সালের বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিশ্লেষণ করলে অত্যন্ত চমৎকার আলাপ তোলা যায়। আগাম্বেন স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং তার বিপরীতে এক নতুন ধরনের প্রতিরোধ গড়ে ওঠার কথা বলেছিলেন, যা দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর অভ্যুত্থানে, বিশেষ করে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জুলাই অভ্যুত্থানে বাস্তব ও জীবন্ত প্রতিফলন ঘটেছে।

‘হোয়াটএভার সিঙ্গুলারিটি’ ও জুলাই অভ্যুত্থান

আগাম্বেন বইটিতে ‘হোয়াটএভার সিঙ্গুলারিটি’ ফ্রেজটি ব্যবহার করেছেন। তার দর্শনের এই ধারণার মূল ভিত্তি হলো এমন এক সমাজ বা জনতা, যেখানে মানুষ কোনো নির্দিষ্ট দল, ধর্ম বা মতাদর্শের পরিচয় নিয়ে হাজির হয় না। তারা শুধু ‘যেমন আছে, ঠিক তেমন’ হিসেবে একে অপরের সাথে যুক্ত হয়। জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষিতে, বাংলাদেশের এই আন্দোলন প্রথাগত কোনো বড় রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বা কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের ব্যানারে শুরু হয়নি। প্রথমে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, এরপর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজ, শিক্ষক, অভিভাবক, রিকশাচালক, মাদ্রাসার ছাত্র, ডানপন্থী, বামপন্থী—সবাই কোনো কৃত্রিম রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াই রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। আগাম্বেনের ভাষায় এরা হলেন সেই ‘হোয়াটএভার সিঙ্গুলারিটি’, যারা কোনো নির্দিষ্ট লেবেল ছাড়াই কেবল ‘নিপীড়িত নাগরিক’ হিসেবে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে এক অভূতপূর্ব সংহতি তৈরি করেছিলেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

‘বেয়ার লাইফ’ ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতা

আগাম্বেন তাঁর অন্যান্য কাজের মতো এই বইতেও ইঙ্গিত দিয়েছেন—কীভাবে রাষ্ট্র নাগরিকদের অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের কেবল ‘বেয়ার লাইফ’ বা ‘ক্ষতিযোগ্য জৈবিক অস্তিত্বে’ পরিণত করে। যখন রাষ্ট্র কাউকে এই স্তরে নামিয়ে আনে, তখন তাদের ওপর যেকোনো ধরনের সহিংসতা চালানো বৈধ করে নেওয়া হয়। বিগত স্বৈরাচারী সরকার যখন আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ, র্যাব ও বুলেটের নির্মম ব্যবহার শুরু করে, ইন্টারনেট বন্ধ এবং দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেয়—তখন সাধারণ মানুষের নাগরিক অধিকার সম্পূর্ণ কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। আবু সাঈদ বা মুগ্ধদের বুক পেতে দেওয়া এবং সাধারণ মানুষকে পাখির মতো গুলি করা ছিল নাগরিকদের ‘বেয়ার লাইফ’-এ পরিণত করার রাষ্ট্রীয় চক্রান্ত। কিন্তু এই চরম দমনপীড়নই সাধারণ মানুষের ভেতরের ভয়কে ভেঙে এক নৈতিক জাগরণ তৈরি করে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরিচয়হীন জনতার শক্তি ও রাষ্ট্রের অসহায়ত্ব

আগাম্বেন দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্র সবসময় নাগরিকদের নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে ভাগ করে নিয়ন্ত্রণ করতে পছন্দ করে (যেমন- কে কোন দলের, কে পক্ষে, কে বিপক্ষে)। যখন কোনো জনতা কোনো নির্দিষ্ট ব্যানার বা নেতা ছাড়া কেবল নিজেদের ‘উপস্থিতি’ দিয়ে রাষ্ট্রের মুখোমুখি হয়, তখন রাষ্ট্র তাকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো চাবিকাঠি খুঁজে পায় না। আগাম্বেন একেই রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় ভীতি বলে উল্লেখ করেছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষিতে সরকার প্রথম থেকেই আন্দোলনকারীদের ওপর নির্দিষ্ট তকমা বা পরিচয় (যেমন- ‘রাজাকার’, ‘সন্ত্রাসী’ বা ‘নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের উসকানি’) চাপানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কারণ রাষ্ট্র যদি আন্দোলনকে কোনো নির্দিষ্ট চেনা শত্রুর পরিচয়ে বন্দি করতে পারতো, তবে তা দমন করা সহজ হতো। কিন্তু যখন লাখ লাখ সাধারণ মানুষ কোনো একক নেতা বা দলের নির্দেশ ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নেমে এলো—তখন স্বৈরাচারী রাষ্ট্রযন্ত্র সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। এই পরিচয়হীন ‘জনতার উপস্থিতিই’ স্বৈরাচারের পতন নিশ্চিত করেছিল।

‘কামিং কমিউনিটি’র বাস্তব রূপ

আগাম্বেন যে ভবিষ্যৎ সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, তা কোনো স্থায়ী রাষ্ট্রকাঠামো নয়, বরং এমন এক মুহূর্ত বা অবস্থা যেখানে মানুষ একে অপরের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে কোনো ক্ষমতার লোভ ছাড়াই। ৫ আগস্টের ঠিক পর পর যখন দেশে কোনো সরকার বা পুলিশ ছিল না, তখন ঢাকার রাস্তায় যে দৃশ্য দেখা গিয়েছিল—তা ছিল আগাম্বেনের ‘কামিং কমিউনিটি’র একটি নিখুঁত উদাহরণ। শিক্ষার্থীরা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছে, সাধারণ মানুষ দল বেঁধে মন্দির পাহারা দিচ্ছে, রাস্তা পরিষ্কার করছে, দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকছে—এখানে কোনো আইন বা রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা ছিল না। কোনো দল বা নেতার আদেশ ছাড়াই মানুষ নিজের তাগিদে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছিল। সাময়িকভাবে হলেও বাংলাদেশ এক খাঁটি ‘কামিং কমিউনিটি’ বা পরিচয়হীন মানবিক সমাজের রূপ ধারণ করেছিল।

প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ফাঁদ ও পরিচয়ের রাজনীতি

জুলাই অভ্যুত্থানের সেই স্বতঃস্ফূর্ত, পরিচয়হীন এবং দল-মতহীন ‘কামিং কমিউনিটি’র রূপ স্থায়ী না হয়ে এক ধরনের স্থবিরতা বা ব্যর্থতার দিকে যাওয়ার পেছনে গভীর কারণ রয়েছে। আগাম্বেন যে সমাজের কথা বলেছিলেন, সেখানে মানুষ কোনো সুনির্দিষ্ট দলীয়, ধর্মীয় বা আদর্শিক তকমা ছাড়া কেবল ‘মানুষ’ হিসেবে একে অপরের সাথে যুক্ত হয়। জুলাই আন্দোলনেও আমরা তাই দেখেছিলাম। কিন্তু স্বৈরাচারের পতনের ঠিক পর পরই এক ধরনের ‘ক্ষমতার শূন্যতা’ তৈরি হয়। আর এই শূন্যতা তৈরি হতেই পুরোনো এবং নতুন বিভিন্ন পক্ষগুলো আবার তাদের নিজস্ব ‘পরিচয়ের রাজনীতি’ নিয়ে হাজির হয়। যে মানুষগুলো ৫ আগস্টের আগে পরিচয়হীন ‘জনতা’ হিসেবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল, ৫ আগস্টের পর তারা আবার ‘অমুক দল’, ‘তমুক আদর্শ’, ‘মাদ্রাসার ছাত্র’, ‘সেক্যুলার ছাত্র’, ‘ডানপন্থী’ বা ‘বামপন্থী’ ইত্যাদি পুরোনো পরিচয়ের ফ্রেমে ভাগ হয়ে যায়। আগাম্বেনের ‘হোয়াটএভার’ ধারণাকে গ্রাস করে নেয় ক্ষমতার ভাগাভাগির চেনা সমীকরণ।

আগাম্বেনের ‘কামিং কমিউনিটি’র মূল সৌন্দর্যই হলো—এটি প্রথাগত আইন, রাষ্ট্র বা শাসনকাঠামোর বাইরে একটি ‘মুক্ত সম্ভাবনা’। এটি যখনই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে যায়, তখনই তার বিপ্লবী চরিত্র নষ্ট হয়ে যায়। ৫ আগস্টের পর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ বা দেয়ালচিত্র আঁকার যে স্বতঃস্ফূর্ত রূপ ছিল, তা রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতায় স্থায়ী করা সম্ভব ছিল না। একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রকে সচল করতে গিয়ে অনিবার্যভাবেই ল অ্যান্ড অর্ডার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, উপদেষ্টা পরিষদ এবং বিভিন্ন কমিটি গঠনের মতো ‘প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো’ তৈরি করতে হয়েছে। এই প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আবার সাধারণ জনতার হাত থেকে নির্দিষ্ট কিছু ব্যুরোক্রেসি বা প্রতিনিধির হাতে চলে যায়। ফলে আমজনতা আবার সেই ‘শাসিত নাগরিক’ বা ভোতারে পরিণত হয়—যা আগাম্বেনের মুক্ত সমাজের ধারণার পরিপন্থী।

বিপ্লবোত্তর বিভাজন ও শত্রু খোঁজার প্রবণতা

সবচেয়ে বেশি বিপদ হয়েছে বিপ্লবোত্তর বিভাজন ও ‘শত্রু’ খোঁজার প্রবণতা। আগাম্বেন দেখিয়েছেন যে, স্বৈরাচারী রাষ্ট্র যেভাবে মানুষকে ‘পক্ষ-বিপক্ষ’ বা ‘আমাদের লোক বনাম শত্রু’ হিসেবে ভাগ করে শাসন করে, মুক্ত সমাজকে তার বাইরে আসতে হবে। অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করার চেয়ে বরং বাদ দেওয়ার রাজনীতি প্রবল হয়ে ওঠে। ‘কে আসল বিপ্লবী আর কে নয়’, ‘কার অবদান বেশি’, ‘কে ফ্যাসিবাদের দোসর’—এ ধরনের নতুন বিভাজন রেখা তৈরি হয়। যখনই একটি সমাজ নিজের ভেতরে ক্রমাগত ‘শত্রু’ খুঁজতে শুরু করে এবং নাগরিকদের ভিন্নমতের কারণে বহিষ্কার বা কোণঠাসা করতে থাকে, তখন আগাম্বেনের সেই সর্বজনীন ‘আসন্ন সম্প্রদায়’ আর টিকে থাকে না।

অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও দার্শনিক মুক্তির দ্বন্দ্ব

বলে রাখা ভালো, অর্থনৈতিক ও বৈষয়িক বাস্তবতায় আগাম্বেনের দর্শন অত্যন্ত তাত্ত্বিক ও কাব্যিক। কিন্তু একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত বা ক্রান্তিকালীন অর্থনীতিতে মানুষের টিকে থাকার বাস্তব লড়াই অনেক বেশি রূঢ়। ৫ই আগস্টের রোমান্টিকতা কেটে যাওয়ার পর সাধারণ মানুষের সামনে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং দৈনন্দিন নিরাপত্তার প্রশ্নগুলো বড় হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ যখন নিজের জীবন ও জীবিকা নিয়ে অনিরাপত্তায় ভোগে, তখন তারা দার্শনিক মুক্তির চেয়ে একটি কার্যকর ও শক্তিশালী ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’ বা কর্তৃত্ববাদী শাসন বেশি আশা করে—যা তাদের সাময়িক স্থায়িত্ব দিতে পারবে। এই বৈষয়িক চাহিদাই মানুষকে আবার প্রথাগত শাসনব্যবস্থার দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

ঐতিহাসিক সমান্তরাল: ফরাসি বিপ্লব ও আরব বসন্ত

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে ক্ষমতার যে দ্রুত রূপান্তর, আদর্শিক বিভাজন এবং এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, তা পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯) এবং ২০১১ সালের আরব বসন্তের (বিশেষ করে মিশর ও তিউনিসিয়া) মতো বড় ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, বিপ্লবের পর ক্ষমতার চেনা কাঠামো ভেঙে পড়ার পর প্রায় প্রতিটি সমাজেই একই ধরনের দার্শনিক ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে।

ফরাসি বিপ্লবের মূল স্লোগান ছিল—সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা। কিন্তু রাজা ষোড়শ লুইয়ের পতনের পর ফ্রান্সে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা এক অন্ধকার অধ্যায়ের জন্ম দেয়, যা ইতিহাসে ‘রেইন অব টেরর’ বা সন্ত্রাসের রাজত্ব নামে পরিচিত। ম্যাক্সিমিলিয়েন রবসপিয়ারের নেতৃত্বাধীন ‘জ্যাকোবিন’ গোষ্ঠী ক্ষমতা হাতে নিয়ে বিপ্লবকে ‘শুদ্ধ’ রাখার নামে চরমপন্থী পথ বেছে নেয়। কে আসল বিপ্লবী আর কে প্রতিবিপ্লবী—এই পরীক্ষার নামে হাজার হাজার মানুষকে গিলোটিনে চড়ানো হয়। শেষ পর্যন্ত এই চরমপন্থা এতটাই হিংস্র হয়ে ওঠে যে, রবসপিয়ার নিজেই গিলোটিনে প্রাণ হারান এবং ফ্রান্সকে এক বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দেয়, যা পরবর্তীতে নেপোলিয়নের একনায়কতন্ত্রের পথ সুগম করে।

২০১১ সালে মিশরের কায়রোর তাহরির স্কয়ার লাখ লাখ মানুষ হোসনি মোবারকের ৩০ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়েছিল। বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের মতো তাহরির স্কয়ারের আন্দোলনও ছিল মূলত নেতৃত্বহীন, স্বতঃস্ফূর্ত এবং ফেসবুক-টুইটার চালিত একটি যুব বিদ্রোহ। কিন্তু মোবারকের পতনের পর মিশরে এক বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা তৈরি হয়। তাহরির স্কয়ারের যে তরুণরা রক্ত দিলো, তাদের কোনো সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল বা রাষ্ট্র পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। ফলে ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত চলে যায় মিশরের সবচেয়ে সুসংগঠিত দুটি শক্তির কাছে—একদিকে ধর্মীয় রক্ষণশীল দল ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’ এবং অন্যদিকে সুচতুর মিশরীয় সেনাবাহিনী। ব্রাদারহুড ক্ষমতায় এলেও তারা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনে ব্যর্থ হয়, যা পুনরায় মেরুকরণ তৈরি করে এবং মাত্র দুই বছরের মাথায় সেনাবাহিনী (জেনারেল সিসি) আবার ক্ষমতা দখল করে স্বৈরতন্ত্র ফিরিয়ে আনে।

মিশরের এই অভিজ্ঞতা জুলাই-উত্তর বাংলাদেশের জন্য একটি বড় দার্শনিক ও রাজনৈতিক সতর্কতা। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশেও একটি প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা তৈরি হয়। যে শিক্ষার্থীরা রাজপথে প্রাণ দিলো, তারা প্রথাগত রাজনৈতিক শক্তি ছিল না। ফলে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো, আমলাতন্ত্র এবং বিভিন্ন গোষ্ঠী যার যার মতো করে ক্ষমতার ভাগাভাগি এবং পুনর্বিন্যাসে মেতে ওঠে। আন্দোলনকারী শক্তির মাঝে সুনির্দিষ্ট ও সুদূরপ্রসারী প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা না থাকলে, অভ্যুত্থান বা বিপ্লবের ফসল কীভাবে অন্য সুসংগঠিত বা প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির হাতে চলে যায়—আরব বসন্ত তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

হান্না আরেন্টের ‘লিবারেশন’ ও ‘ফ্রিডম’

জার্মান-আমেরিকান রাজনৈতিক দার্শনিক হান্না আরেন্ট তার বিখ্যাত ‘অন রেভ্যুলুশন’ বইয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য দেখিয়েছেন—‘লিবারেশন’ (মুক্তি) এবং ‘ফ্রিডম’ (স্বাধীনতা)। তিনি বলছেন, লিবারেশন হলো কোনো অত্যাচারী বা স্বৈরাচারী শাসককে ক্ষমতা থেকে টেনে হিঁচড়ে নামানো। এটি একটি নেতিবাচক শক্তি। বাংলাদেশ ৫ আগস্ট ‘লিবারেশন’ অর্জন করেছে। ফ্রিডম হলো স্বৈরাচারের পতনের পর এমন একটি স্থায়ী রাজনৈতিক ও আইনি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত হবে। এটি একটি ইতিবাচক কাজ। আরেন্টের তত্ত্ব মতে, ফরাসি বিপ্লব বা আরব বসন্ত ব্যর্থ হয়েছিল কারণ তারা ‘লিবারেশন’-এর পর ‘ফ্রিডম’ বা নতুন স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেনি, তারা কেবল প্রতিশোধ ও ক্ষমতার লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল।

উপসংহার: আশার আলো ও চ্যালেঞ্জ

সুতরাং, জুলাই অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে দুটি আশার কথা বলাই যায়। প্রথমত, পশ্চিমা দুনিয়ায় যেখানে প্রতিরোধ অনেক সময় তাত্ত্বিক বা নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে, দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশে তা এক চরম আত্মত্যাগের ও শারীরিক উপস্থিতির রূপ নেয়। আগাম্বেন ক্ষমতার যে অন্ধকার রূপ এঁকেছেন, ‘কামিং কমিউনিটি’র মাধ্যমে তার থেকে মুক্তির যে সূক্ষ্ম পথ বাতলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম দিনগুলো ছিল সেই মুক্তির এক উজ্জ্বল পূর্বাবাস। দ্বিতীয়ত, স্বৈরাচারী রাষ্ট্র নাগরিকদের যেভাবে কেবল ‘শাসিত’ বা ‘নিয়ন্ত্রিত বস্তু’ হিসেবে দেখতে চায়, জুলাই অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে যে, চরম দমনপীড়নের মুখেও মানুষ সব কৃত্রিম পরিচয়কে ছাপিয়ে এক অনন্য ‘আসন্ন সম্প্রদায়’ হয়ে উঠতে পারে। যদিও প্রাতিষ্ঠানিকতার চাপে সেই আদি রূপ ধরে রাখা কঠিন, কিন্তু এই ধরনের জনজাগরণ রাষ্ট্র ও নাগরিকের চিরন্তন ক্ষমতার ভারসাম্যকে চিরতরে বদলে দেয়।