ঢাকায় ৫০০ কিমি সড়ক খনন করবে ওয়াসা, নগরবাসীর নতুন ভোগান্তি
ঢাকায় ৫০০ কিমি সড়ক খনন করবে ওয়াসা, বাড়ছে ভোগান্তি

সড়ক খুঁড়ে পয়োনিষ্কাশন লাইন তৈরির কাজ চলছে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের সিপাহীবাগ টেম্পোস্ট্যান্ড এলাকায়। ছবিটি ১৩ জুন বিকেলের। রাজধানীর রাস্তা ভালো থাকলে নগরবাসী স্বস্তি পান। তবে নগরবাসীর স্বস্তি বেশি দিন স্থায়ী হয় না। কারণ, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহসহ পয়োনিষ্কাশনের মতো কাজে প্রায়ই ঢাকায় রাস্তা কাটা বা খোঁড়াখুঁড়ি করে বিভিন্ন সংস্থা। এ ক্ষেত্রে এমনও দেখা যায় যে এক সংস্থার কাজের পর একই সড়কে আরেকটি সংস্থা নেমে যায়। এতে ভোগান্তি দীর্ঘায়িত হয়।

নতুন প্রকল্পে ৫০০ কিলোমিটার সড়ক খনন

নগরবাসী এমন আরেক ভোগান্তির অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। ঢাকায় ৫০০ কিলোমিটারের বেশি সড়ক কাটতে যাচ্ছে ঢাকা ওয়াসা। সংস্থাটির ‘ঢাকা স্যানিটেশন ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের’ আওতায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা নির্মাণ–পুনর্নির্মাণের জন্য ধাপে ধাপে এই সড়ক খনন করা হবে।

ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুসারে, প্রকল্পটির ব্যয় ৫ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে কাজ শুরু হয়েছে। কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালে। বিদেশি ঋণনির্ভর এ প্রকল্পে অর্থায়ন করছে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি)।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পূর্ববর্তী প্রকল্পের অভিজ্ঞতা

ঢাকা ওয়াসা এর আগে পানির সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করতে একটি প্রকল্প (ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট) বাস্তবায়ন করে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে এ প্রকল্পের কাজ ছিল পুরোনো পানির পাইপলাইন বদলানো, নতুন পাইপ বসানো, বাসাবাড়ির পানির সংযোগ ঠিক করা বা বৈধ করা, পানির অপচয় কমানো। এসব কাজ করতে গিয়ে ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সড়ক খনন করতে হয়। এখন পয়োনিষ্কাশন প্রকল্পের জন্য আবার ঢাকার সড়ক কাটার কাজ শুরু হলো। ফলে নগরের বাসিন্দাদের আরেক দফা খোঁড়াখুঁড়ির ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশেষজ্ঞদের মতামত

নগর–পরিকল্পনাবিদ ও ভুক্তভোগীরা বলছেন, পানি সরবরাহের লাইন ও পয়োনিষ্কাশন লাইন তৈরি—দুটি কাজই মাটির নিচের অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। সঠিক সময়ে সমন্বিত পরিকল্পনা করা গেলে একই সড়ক একাধিকবার কাটার দরকার পড়ত না। এতে নগরবাসীও দীর্ঘ ভোগান্তি থেকে রেহাই পেত।

‘প্রযুক্তিগত’ জ্ঞানের অভাবে অতীতে একই সড়ক বারবার খুঁড়তে হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আমিনুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, একই রাস্তা যাতে বারবার কাটতে না হয়, সেই বিষয়টি তাঁরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষকদের সঙ্গে বসে এমনভাবে পরিকল্পনা তৈরির চেষ্টা করবেন, যাতে সড়ক বারবার কাটতে না হয়। মানুষের ভোগান্তি কম হয়।

অবশ্য রাস্তা বারবার কাটার কারণ হিসেবে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবকে দায়ী মনে করেন না নতুন প্রকল্পটির পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম মিঞা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পাসের মতো প্রশাসনিক জটিলতা, প্রকল্পভেদে সময়সীমার ভিন্নতা, নির্দিষ্ট বরাদ্দ, বিপুল অঙ্কের অর্থের প্রয়োজনীয়তা, উন্নয়ন সহযোগীদের ভিন্নতা, উন্নয়ন সহযোগীদের পৃথক শর্তের মতো বিষয় সমন্বিত কাজে বাধা সৃষ্টি করে।

পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা

ঢাকার পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল। অনেক এলাকায় নোংরা পানি খাল, নালা ও নদীতে গিয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ঢাকায় পরিকল্পিত, কার্যকর পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি আছে। নতুন প্রকল্পটির আওতায় ৫০ হাজার নতুন গৃহসংযোগ, পাগলা পয়ঃশোধনাগারের সক্ষমতা বাড়ানো ও প্রতিদিন ১৫ কোটি লিটার বর্জ্য পানি শোধনের লক্ষ্য রয়েছে। তবে নগর–পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, সমস্যা প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়, সমস্যা হলো কাজের ধরন ও নাগরিক ভোগান্তি সামলানোর ব্যবস্থা নিয়ে।

বর্তমান কাজের অগ্রগতি

ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের কাজে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ৪৫৩ কিলোমিটার এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ৭৬ কিলোমিটার সড়ক কাটা হবে। ইতিমধ্যে নিউমার্কেট, আজিমপুর, কমলাপুর, মগবাজার, খিলগাঁও ও মতিঝিলের কিছু এলাকায় খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়েছে।

বর্ষা মৌসুম শুরু হয়ে গেছে। বর্ষার সময় ঢাকায় রাস্তা কাটার অভিজ্ঞতা নগরবাসীর জন্য মোটেই সুখকর নয়। কারণ, খনন করা অংশে পানি জমে যায়। কাদা তৈরি হয়। যান চলাচল ব্যাহত হয়। অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি সেবা আটকে যায়। মানুষের চলাচলে ব্যাঘাত ঘটে। ভালো সড়ক কেটে ঠিকমতো পুনর্নির্মাণ না করলে তার স্থায়িত্বও কমে যায়।

প্রকল্পভুক্ত আজিমপুর কবরস্থানের পাশের একটি এলাকার বাসিন্দা সানাউল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঢাকায় রাস্তা কাটার ক্ষেত্রে মানুষের ভোগান্তির কথা কেউ ভাবে না। নিরাপত্তার বিষয়টিও অনেক ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। কাজের স্থানে সতর্কতামূলক ফিতা থাকে না। সাইনবোর্ড থাকে না। কাজের সময়সীমা জানানো হয় না।’

সমন্বয়ের অভাব

ডিএসসিসির একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, পরিকল্পনা–সমন্বয় করে পানির পাইপলাইন ও পয়োনিষ্কাশন লাইনের কাজ একই সময়ে করা গেলে মানুষের ভোগান্তি কম হতো। একবার রাস্তা কেটে পানি সরবরাহের পাইপ বসানো, পরে আবার একই ধরনের খনন করে পয়োনিষ্কাশনের লাইন বসানো—এতে শুধু নাগরিক ভোগান্তিই বাড়ে না, সড়কের স্থায়িত্বও কমে যায়।

অবশ্য ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের পরিচালক মো. ওয়াজ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, সমন্বয় করে রাস্তা কেটে একসঙ্গে দুটি কাজ করা কঠিন। কারণ, একেকটি কাজে বিদেশি একেক সংস্থা অর্থায়ন করে। আর তাদের নীতিমালা, শর্তও থাকে আলাদা।

নীতিমালা ও বাস্তবতার ফারাক

মানুষের দুর্ভোগ কমাতে ২০১৯ সালে ‘ঢাকা মহানগরীর সড়ক খনন নীতিমালা’ করা হয়েছিল। ডিএনসিসি, ডিএসসিসি ছাড়াও ঢাকা ওয়াসা, তিতাস গ্যাস, ডিপিডিসি, ডেসকো, বিটিসিএলের মতো সংস্থার মতামত নিয়ে এই নীতিমালা করা হয়। নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো এলাকার পুরো সড়ক একসঙ্গে খোঁড়া যাবে না। মাসের পর মাস একটানা সড়ক খোলা রাখা যাবে না। খননকাজ ১৫ দিনের ভাগে করতে হবে। ধুলা কমাতে নিয়মিত পানি ছিটাতে হবে। সতর্কীকরণ ফিতা দিয়ে এলাকা ঘিরে রাখতে হবে। চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়ে নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা যাবে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সড়ক কাটলে মূল ক্ষতির পাঁচ গুণ জরিমানা হবে।

নীতিমালায় বর্ষা নিয়েও সতর্কতা আছে। ঢাকায় বর্ষা মৌসুমে (জুন–অক্টোবর) জরুরি সেবা ছাড়া সড়ক খনন না করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বিভিন্ন সংস্থা প্রায়ই এ সময়ে সড়ক খননের কাজ করে। আর বর্ষায় সড়ক খনন করলে ভোগান্তির মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

সমঝোতা স্মারকের শর্ত

ঢাকা স্যানিটেশন ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্প বাস্তবায়নে দুই সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক করেছে ঢাকা ওয়াসা। এতে বলা হয়েছে, সড়ক খননের আগে নির্দিষ্ট সময়সূচি দিতে হবে। অনুমতির জন্য আবেদন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন সরেজমিন যাচাই করে ফি নির্ধারণ করবে।

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, সড়ক খনন বাবদ দুই সিটি করপোরেশনের জন্য ৬৩০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। খননের ফলে রাস্তা, ফুটপাত, নর্দমা বা অন্য অবকাঠামোর ক্ষতি হলে তা ঢাকা ওয়াসাকে নিজ খরচে মেরামত করতে হবে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত, সাইনবোর্ড ঝোলানো, ব্যারিকেড তৈরি, ধুলা নিয়ন্ত্রণ, খনন করা মাটি, আবর্জনা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরানোসহ দুর্ঘটনার দায়দায়িত্বের কথা সমঝোতা স্মারকে আছে।

তবে কাগজের শর্ত আর বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফারাকের চিত্র অতীতে অনেক দেখা গেছে। অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, জনভোগান্তি নিয়ে গণমাধ্যমে হরহামেশাই প্রতিবেদন হয়েছে।

ক্ষেত্র পরিদর্শনের চিত্র

১৩ জুন প্রকল্পভুক্ত খিলগাঁওয়ের সিপাহীবাগ টেম্পোস্ট্যান্ড এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ব্যস্ত একটি সড়কের মধ্যে গর্ত করা। চারপাশে টিন দিয়ে বেড়া দেওয়া। এ কারণে এ সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। পাশেই সিপাহীবাগ নবাববাড়ী মোড়ে গিয়েও একই চিত্র দেখা যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা ও দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত রমজান শুরুর আগে থেকে রাস্তা বন্ধ করে কাজ শুরু হয়েছে। এখনো চারপাশে টিন দিয়ে বেড়া দিয়ে রাখা হয়েছে। কবে এই কাজ শেষ হবে, কবে সড়ক উন্মুক্ত করা হবে, সে–সংক্রান্ত কোনো সাইনবোর্ড টাঙানো হয়নি।

ঢাকা ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, এখানকার কাজ শেষ হতে আরও ছয় মাস সময় লাগতে পারে।

একই দিন নিউমার্কেট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়ক খুঁড়ে পাইপ বসানোর কাজ শেষ। তবে রাস্তা এখনো ঢালাই দেওয়া হয়নি। কয়েকটি স্থানে মাটি দিয়ে গর্ত ভরাট করা হয়েছে। কয়েকটিতে ইট বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় লোকজন বলেন, সড়কের অবস্থা এমন থাকলে স্বাভাবিকভাবে চলা করা যায় না।

ডিএসসিসির এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, আগে বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য যাত্রাবাড়ী ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন সড়ক একাধিকবার কাটা হয়েছে। এতে বারবার ভোগান্তি তৈরি হয়েছে।

পরিকল্পনাবিদদের বক্তব্য

একই সড়ক একবার পানির লাইনের জন্য, আরেকবার পয়োবর্জ্য লাইনের জন্য কাটা কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয় বলে মনে করেন নগর–পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টর (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অদক্ষতা, পরিকল্পনাহীনতা ও সমন্বয়হীনতার ফলাফল। মাটির নিচের অবকাঠামোর কাজ একসঙ্গে পরিকল্পনা করে করা উচিত। সেটি না হওয়ায় উন্নয়ন প্রকল্পের নামে নাগরিকদের বারবার একই দুর্ভোগে ফেলা হচ্ছে। এতে শুধু মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে না, সরকারি অর্থের অপচয়ও হচ্ছে। ভালো সড়কের স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।