যুগান্তরের অকাট্য তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কোতোয়ালি থানার ওসি আফতাব উদ্দিনকে অবশেষে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বুধবার (১৭ জুন) রাত ৯টার দিকে তাকে দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়।
তদন্তে সত্যতা মেলায় ব্যবস্থা
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক, প্রশাসন ও অর্থ) মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরী জানান, যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও সরবরাহ করা তথ্য-প্রমাণ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেছে। পুলিশ হেডকোয়ার্টারে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়ে ওসি আফতাবের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। এর ফলে ভেস্তে গেছে তার দায়মুক্তির ‘কোটি টাকার মিশন’।
ঘটনার বিবরণ
গত বছরের ৮ ডিসেম্বর বাকলিয়া থানা-পুলিশ কক্সবাজার জেলা আদালতের এক বিচারকের গানম্যান কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনকে ১ লাখ ইয়াবাসহ আটক করে। কিন্তু মামলা না করে ইয়াবাসহ তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং উদ্ধারকৃত ইয়াবা পুলিশ সদস্যরা আত্মসাৎ করেন। ওসি আফতাবের প্রত্যক্ষ নির্দেশেই এই ঘটনা ঘটে এবং তিনি পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা
ঘটনার পর যুগান্তরের প্রতিবেদক ওসি আফতাবের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি প্রতিবেদকের মোবাইল নম্বর ব্লক করে দেন। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, আফতাব জড়িত সবাইকে ডেকে পবিত্র কুরআন শরীফ ছুঁয়ে শপথ করান— যেন মরে গেলেও কেউ এই ঘটনা স্বীকার না করেন। পরে যুগান্তরে ‘চট্টগ্রামে উদ্ধার সোয়া ২ কোটি টাকার ইয়াবা গায়েব!’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে আদালতে স্বপ্রণোদিত মামলা ও পুলিশের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়।
আট পুলিশ সদস্য বরখাস্ত
তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে বাকলিয়া থানার আট পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তারা হলেন— এসআই মো. আল-আমিন সরকার, এসআই মো. আমির হোসেন, এএসআই সাইফুল আলম, এএসআই জিয়াউর রহমান, এএসআই সাদ্দাম হোসেন, এএসআই এনামুল হক, কনস্টেবল রাশেদুল হাসান ও কনস্টেবল উম্মে হাবিবা স্বপ্না। এছাড়া মূল অভিযুক্ত কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেন ও পরিদর্শক তানভীর আহমেদকেও বরখাস্ত করা হয়েছে।
ওসি আফতাবের ‘কোটি টাকার মিশন’
ওসি আফতাব নিজেকে বাঁচাতে সাতকানিয়ার এক জামায়াত নেতা ও এক ছাত্রদল নেতার মাধ্যমে প্রতিবেদককে মোটা অঙ্কের ঘুষের প্রস্তাব দেন এবং তদন্ত কমিটির কাছে সাক্ষী না দেওয়ার অনুরোধ জানান। প্রতিবেদককে বশে আনতে না পেরে তিনি ‘কোটি টাকার মিশনে’ নামেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঘনিষ্ঠ রকি বড়ুয়ার মাধ্যমে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বাঁচার চেষ্টা করেন এবং কতিপয় সাংবাদিককে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে তার পক্ষে পজিটিভ সংবাদ প্রকাশ করান।
তদন্ত প্রতিবেদনে ওসির অপরাধ
মহানগর পুলিশের ৬ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে ওসি আফতাব উদ্দিনকে সরাসরি অভিযুক্ত করা হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৪৬ ধারা অনুযায়ী অপরাধ আমলযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তিনি কোনো আইনি ব্যবস্থা নেননি। পিআরবির ২৪৪ বিধি ও পুলিশ আইনের ২৯ ধারা লঙ্ঘন করেছেন। তিনি ইয়াবা গায়েবের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেননি, এমনকি সিসিটিভি ফুটেজও সংরক্ষণ করেননি। ওসির নির্দেশেই ইয়াবাসহ আটক ইমতিয়াজকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার আশ্বাস
সিএমপির বর্তমান পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, মাদক কারবারি পুলিশ হোক বা সাধারণ জনগণ, আইনের চোখে সবাই সমান অপরাধী। পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে নির্দেশনা আসার পর দ্রুত সংশ্লিষ্ট আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



