বাজেট বাস্তবায়নে অর্থ নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারই বড় চ্যালেঞ্জ: অর্থমন্ত্রী
বাজেট বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারই বড় চ্যালেঞ্জ: অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের সংস্থান নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে তিনি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, ব্যাংক ও পুঁজিবাজার সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী

সোমবার (২৯ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৮তম দিনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এই মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “সরকার এমন এক সময়ে বাজেট প্রণয়ন করেছে, যখন একদিকে ছিল ‘ফ্যাসিবাদী সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বিপর্যস্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো’, অপরদিকে ছিল নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা। তাই এই বাজেট কেবল বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি নয়, বরং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কাঠামোগত সংস্কার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা।”

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত কৌশল

অর্থমন্ত্রী বলেন, “উচ্চ মূল্যস্ফীতি বর্তমানে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় এবং সরকার এটিকে কেবল অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচনা করছে।” তিনি জানান, মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, ৬০টি নিত্যপণ্যে উৎসে কর কমানো, ব্যবসার খরচ কমাতে ডিরেগুলেশন ও ডিজিটাইজেশন, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা, বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের আশাবাদ

প্রস্তাবিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে সংশয়ের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রবৃদ্ধি কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক আস্থার প্রতিফলন। সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবাখাত সম্প্রসারণ, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতিকে মূলধারায় আনা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।

‘থ্রিআর’ কৌশলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার

অর্থমন্ত্রী বলেন, “সরকার রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন, রেস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসেলারেশন— এই তিন ধাপের ‘থ্রিআর’ কৌশল বাস্তবায়ন করছে।” অর্থমন্ত্রীর দাবি— “অতীতের ভুল নীতি, লুটপাট, অর্থপাচার, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, বিনিময় হার বিকৃতি এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকট অর্থনীতিকে চাপে ফেললেও সরকারের গৃহীত পদক্ষেপে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে।”

রাজস্ব আদায়ে করভিত্তি সম্প্রসারণ

রাজস্ব আহরণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়ে উত্থাপিত উদ্বেগের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, “সরকার করের হার বাড়িয়ে নয়, বরং করভিত্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে চায়।” এই লক্ষ্যে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব প্রশাসন পৃথকীকরণ, কর ব্যবস্থার অটোমেশন, কর ফাঁকি রোধ এবং ডিরেগুলেশনের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে সামর্থ্য অনুযায়ী ফ্ল্যাট রেটে ভ্যাট প্রদানের ব্যবস্থা করা হলেও কাঁচাবাজার ও ক্ষুদ্র মুদি দোকান এই ব্যবস্থার বাইরে থাকবে।

উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে পরিচালন ব্যয় কমানো

সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, “সরকার পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর নীতি নিয়েছে।” প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয়ের মধ্যে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অপরদিকে পরিচালন ব্যয়ের অংশ ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর

অর্থমন্ত্রী বলেন, “বিগত সরকারের সময়ে অপ্রয়োজনীয় ঋণ গ্রহণের ফলে দেশের ঋণ ধারণক্ষমতা নিম্ন ঝুঁকি থেকে মধ্যম ঝুঁকিতে নেমে এসেছে।” মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ৯ লাখ ৪৯ হাজার ১৮১ কোটি টাকা।

পাচার হওয়া সম্পদ ফেরাতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ

ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, “পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ ফিরিয়ে আনতে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। চলতি বছরের মে পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় দেশে ও বিদেশে প্রায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজ করা হয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়েছে। মালয়েশিয়া ও হংকংয়ের সঙ্গে দুটি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ট্রিটি চূড়ান্ত হয়েছে।”

পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের আশ্বাস

একীভূত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেন, “সাধারণ মানুষের আমানতের নিরাপত্তাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ব্যক্তিগত আমানতকারীরা তাদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা তুলতে পারবেন। বাকি অর্থ ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হবে।”

ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের বিতর্কিত ধারা বাতিল

ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর বিতর্কিত ধারা ১৮(ক) বিভিন্ন অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, “জনগণের সম্পদ যারা লুট করেছে তাদের বিরুদ্ধে কোনও ছাড় দেওয়া হবে না।”

পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে কর সুবিধা

দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে অর্থমন্ত্রী একগুচ্ছ কর সুবিধার ঘোষণা দেন। তিনি জানান, জিরো কুপন বন্ডের আয় করমুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে যে কোনও পরিমাণ শেয়ার হস্তান্তর করে তালিকাভুক্ত হলে কোম্পানি কর ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

বাস্তবায়নই হবে বাজেটের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

বাজেটের সফলতা ঘোষণায় নয়, বাস্তবায়নে নিহিত— এ কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, “ভালো নীতি ও পরিকল্পনাও কার্যকর বাস্তবায়নের অভাবে অনেক সময় প্রত্যাশিত ফল দেয় না। তাই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।” তিনি বলেন, “বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন আগামী দিনে বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।”

১০ অগ্রাধিকার খাতকে সামনে রেখে বাজেট বাস্তবায়ন

অর্থমন্ত্রী বলেন, “বাজেট বক্তৃতায় ঘোষিত ১০টি অগ্রাধিকার খাতকে সামনে রেখেই আগামী অর্থবছরের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।” অগ্রাধিকার খাতগুলো হলো— সবার জন্য উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগনির্ভর ও কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি, ডিরেগুলেশনের মাধ্যমে সহজ ব্যবসা পরিবেশ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ, প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন।

ফলাফলভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় জোর

বাজেট বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়াতে সরকার ফলাফলভিত্তিক ব্যবস্থাপনা চালু, ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রকল্প পর্যবেক্ষণ, নির্ধারিত সময় ও ব্যয়সীমার মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন, প্রকল্প মূল্যায়ন পদ্ধতি শক্তিশালীকরণ, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি জোরদারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।