দেশজুড়ে বিএনপি নেতাকর্মী হত্যা: আইনশৃঙ্খলা কি নিয়ন্ত্রণের বাইরে?
দেশজুড়ে বিএনপি নেতাকর্মী হত্যা: আইনশৃঙ্খলা কি নিয়ন্ত্রণের বাইরে?

দেশজুড়ে চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সহিংস অপরাধের পাশাপাশি বাড়ছে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সন্ত্রাস দমনের অঙ্গীকার করেছিল ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশানুরূপ কোনও উন্নতি হয়নি। ক্ষমতায় আসার পরও আধিপত্যের লড়াইয়ে দলটির নেতাকর্মীরা একের পর এক হত্যার শিকার হচ্ছেন।

শুধু গত একমাসেই দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের অন্তত পাঁচজন নেতা হত্যার শিকার হয়েছেন। প্রকাশ্যে গুলি, কুপিয়ে কিংবা ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় তাদের। ঘটনার ধরনও উদ্বেগজনক। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে? নাকি ক্ষমতাকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব ও আধিপত্যের লড়াই নতুন মাত্রা পাচ্ছে?

অবশ্য বিএনপির দাবি, বিচ্ছিন্ন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেও সাংগঠনিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা চলছে। অপরদিকে পুলিশ বলছে, বেশির ঘটনাই ‘টার্গেট কিলিং’— যার পেছনে রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত কিংবা অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত থাকতে পারে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

একমাসে পাঁচ রাজনৈতিক হত্যা

সর্বশেষ শনিবার (১৩ জুন) দুপুরে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে (৪৫)। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সিএনজিচালিত অটোরিকশায় এসে ৫ থেকে ৭ জন অস্ত্রধারী তাকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি চালিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। মাসুদুল হক রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন।

এর মাত্র একদিন আগে, ১২ জুন খুলনার লবণচরা থানার মাথাভাঙা এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলামকে (৩৫)। ‘ঢাকাইয়া রফিক’ নামে পরিচিত এই নেতা বটিয়াঘাটা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গত মঙ্গলবার (৯ জুন) বাগেরহাটের ফকিরহাটে কৃষক দল নেতা বাদল মোড়লকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই ঘটনায় আহত হন স্থানীয় বিএনপি নেতা আবদুল্লাহ মোড়ল।

ওইদিন রাতে রাজধানীর মৌচাক এলাকায় যুবদল নেতার ছুরিকাঘাতে নিহত হন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা বিল্লাল হোসেন তালুকদার।

এর আগে ২১ মে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ওসমান গণিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, স্থানীয় প্রভাব, কিংবা অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্বে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

পুলিশের ভাষ্য: টার্গেট কিলিং ঠেকানো কঠিন

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক বিরোধ, ব্যক্তিগত শত্রুতা, কিংবা অন্যান্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট কারণে ঘটেছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘যারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে টার্গেট কিলিং অনেক সময় আগাম শনাক্ত করা কঠিন।’’

তার দাবি, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের গ্রেফতারে দেশজুড়ে বিশেষ অভিযান চলছে। ইতোমধ্যে কয়েক হাজার ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে।

পুলিশের এই শীর্ষ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘‘নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেক জায়গায় দলীয় কোন্দল সামনে এসেছে। তবে পুলিশকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কে কোন দলের, তা বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। পুলিশের নিরপেক্ষতা যাতে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সে বিষয়ে আমরা সতর্ক।’’

ক্ষমতা মানেই কি প্রভাব ও সুবিধার লড়াই?

বিশ্লেষকরা বলছেন, বেশিরভাগ ঘটনার পেছনে কেবল আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা নয়, বরং স্থানীয় আধিপত্য, অর্থনৈতিক স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতাও কাজ করছে।

তাদের মতে, শুধু বিশেষ অভিযান বা গ্রেফতার দিয়ে পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের ভেতরে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অপরাধে জড়িত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে।

নয়তো ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের প্রাণহানি থামবে না। আর সাধারণ মানুষের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি আরও গভীর হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে সংঘাতের একটি ঐতিহাসিক ধারা রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘‘কোনও রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলে পদ-পদবি, প্রভাব বিস্তার, অর্থনৈতিক সুবিধা এবং অপরাধ অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে নানা ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। অনেক কর্মী-সমর্থকের মধ্যে এমন ধারণা কাজ করে যে, দল ক্ষমতায় এলে তারাও ক্ষমতার সুবিধাভোগী হবেন। এই মানসিকতা থেকেই অনেক সংঘাতের জন্ম হয়।’’

তৌহিদুল হক বলেন, ‘‘রাষ্ট্রকে একটি রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থে সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দলীয় ও রাষ্ট্রীয়— দুই পর্যায়েই কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে রাজনৈতিক সহিংসতা কমবে এবং সমাজে নিরাপত্তাবোধ বাড়বে।’’

‘বড় দলে নানা ধরনের মানুষ থাকে’

বিষয়টি নিয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিএনপি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল। এখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও মানসিকতার মানুষ কাজ করেন। ফলে অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যায়।’’

তিনি বলেন, ‘‘অতীতেও এমন ঘটনা ঘটেছে। আমরা এগুলো কখনও সমর্থন করি না। দলের পক্ষ থেকে সাংগঠনিকভাবে সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে।’’