ক্ষমতায় এসেও দলীয় কাজে স্থবিরতা কাটছে না বিএনপির
ক্ষমতায় এসেও দলীয় কাজে স্থবিরতা কাটছে না বিএনপির

বিগত ১৭ বছরে প্রশাসন ও আওয়ামী লীগের কঠোরতার মধ্যেও রাজপথে সক্রিয় ছিলেন বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। প্রায় প্রতিদিনই কোনও না কোনও ইস্যুতে মিছিল-সমাবেশ ছিল সাধারণ বিষয়। আর সমসাময়িক ইস্যুতে সংবাদ সম্মেলন করতেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বা স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। নয়াপল্টন ও গুলশান কার্যালয়ের আশপাশে সব সময় নেতাকর্মীদের পদচারণা ছিল দৃশ্যমান।

তবে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর দলীয় কাজে কিছুটা স্থবিরতা নেমে এসেছে। দলের ভেতরে ও বাইরে এমন আলোচনা হচ্ছে। অভিযোগ আছে, মূলত সাংগঠনিক নেতারা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকায় দলীয় কাজে সমন্বয় করতে পারছেন না। এ কারণে দিবসকেন্দ্রিক কিছু আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া নতুন কোনও কর্মসূচি নিচ্ছে না দলটি। সর্বশেষ গত ৩০ মে দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচির পর তেমন আর কোনও কর্মসূচি দেখা যায়নি। মাঝে মধ্যে নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ব্রিফ করেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

যুবদলের কমিটি নিয়ে অসন্তোষ

আর ইদানীং যুবদলের কমিটি গঠন নিয়ে অসন্তোষের জেরে মাঝে-মধ্যে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের উপস্থিতি দেখা যায়। এর বাইরে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিরাজ করে সুনসান নীরবতা। শুধু অফিস স্টাফদেরই দেখা যায়। আর গুলশান কার্যালয়ের চিত্রও একই রকম। বিএনপির একটি সূত্র জানায়, সাংগঠনিক কাজ ঝিমিয়ে পড়ার বিষয়টি দলীয় হাইকমান্ডও উপলব্ধি করছেন। তাই তৃণমূল কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য নেতাদের তাগিদ দিয়েছেন তারেক রহমান। সূত্রটি আরও জানায়, এরই মধ্যে দল গোছানোর কাজ চলছে। দলের বিভিন্ন সাংগঠনিক শাখা ও সহযোগী সংগঠনকে ঢেলে সাজানোর পর কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের দিকে এগোতে চায় বিএনপি। তবে যেখানে দলের সাংগঠনিক নেতারা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন, সেখানে কারা করবেন এই কাজ, এটি নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশ্লেষকরা মনে করেন, যেকোনও দলের শীর্ষ নেতারা সরকারের দায়িত্বপূর্ণ পদে থাকলে দলীয় কাজে কিছুটা শূন্যতা বিরাজ করা স্বাভাবিক। এমন বাস্তবতায় বিএনপি কীভাবে এগোবে, সেটাই দেখার বিষয়।

বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতামত

জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ''সাংগঠনিক নেতারা সরকারে থাকলে তো দলীয় কাজে সেভাবে সময় দিতে পারেন না। সেক্ষেত্রে তৃণমূলের সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ের এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হতে পারে।''

তিনি বলেন, ''বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দলটিতে এমন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে কিনা—সেটি দলটির নেতারাই ভালো বলতে পারবেন। বাস্তবতা উপলব্ধি করে হয়তো তারা সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পারেন।''

নতুন রাজনৈতিক কর্মসূচি না থাকার কারণ কী

বিএনপির দলীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর নতুন কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচি দেয়নি দলটি। যে কারণে শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের দিকনির্দেশনামূলক কোনও বক্তব্য শুনতে পারেননি তৃণমূলের কর্মীরা। দলীয় প্রধান তারেক রহমানকেও কাছে পান না অনেক সাধারণ নেতাকর্মী। তাই রাষ্ট্রীয় কোনও কাজে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরের দুই পাশে অবস্থান নিয়ে তাকে স্বাগত জানিয়ে মিছিল করেন তারা।

এর বাইরে গত চার মাসে বড় পরিসরে তাকে কাছে পেয়েছেন দুইবার। এর মধ্যে গত ২৮ মার্চ অফিস করতে নয়াপল্টনে গেলে সেখানে অঘোষিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন তিনি। আর দ্বিতীয়টি গত ১ মে শ্রমিক দলের সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন তারেক রহমান।

সর্বশেষ গত ৩০ মে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীকে ঘিরে কিছুটা সক্রিয় ছিলেন নেতাকর্মীরা। এরপর জুন মাসে তেমন উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি দেখা যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহিলা দলের এক নেত্রী জানান, যেখানে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতসহ ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে সরকারবিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে, সেখানে মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করার মতো কোনও কর্মসূচি দিতে পারেনি বিএনপি। শুধু তাই নয়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৎপরতা নিয়েও নেতাকর্মীদের দলগত কোনও নির্দেশনা দেয়নি ক্ষমতাসীন দলটি।

তবে দলের আরেকটি সূত্র জানায়, সরকার এ মুহূর্তে নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে কাজ করছে। তাই সরকারে থাকা শীর্ষ নেতারাও সেদিকে ব্যস্ত। তাছাড়া এ মুহূর্তে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশকে সরকার নিজ থেকেই উত্তপ্ত করতে চায় না। তাই কঠোর কর্মসূচির দিকে যায়নি।

সরকারে সাংগঠনিক নেতারা, দল গোছাচ্ছেন কারা?

বিএনপির কয়েকজন নেতা জানান, দলের বেশ কয়েকজন সাংগঠনিক নেতা সরকারে থাকায় আগের মতো সংগঠনকে সময় দিতে পারছেন না। তাদের মধ্যে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। আর স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হয়েছেন। সরকারের বিভিন্ন কাজে তাদের সময় দিতে হয়। তাই সেই অর্থে সাংগঠনিক কোনও কর্মসূচিতে তারা থাকতে পারছেন না। এক্ষেত্রে মাঝে-মধ্যে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন রুহুল কবির রিজভী। আর মহাসচিব মির্জা ফখরুল অনেক সময় নিজ নির্বাচনি এলাকা ঠাকুরগাঁওয়ে সময় দিচ্ছেন। অপরদিকে নজরুল ইসলাম খান দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হলেও সরকারি কাজ ও শারীরিক অসুস্থতায় তিনিও দলকে তেমন সময় দিতে পারছেন না।

তবে দলীয় সূত্র জানায়, দল গোছানোতেও মূল দায়িত্বে রয়েছেন এই তিন নেতা। তাদের নেতৃত্বে ইতোমধ্যে সাংগঠনিক বিভাগীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। যারা জেলা ও মহানগর কমিটি পুনর্গঠনে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করবেন। কৌশলগত কারণে এখনই এসব নেতার নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না বলে জানা গেছে।

কাউন্সিল কত দূর?

সাংগঠনিক কাজে স্থবিরতার মধ্যেই আলাপ হচ্ছে বিএনপির কেন্দ্রীয় কাউন্সিল নিয়ে। এ নিয়েও তেমন অগ্রগতি নেই বলে জানা গেছে। গত রমজানের আগে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, কোরবানি ঈদের পর বিএনপির কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হতে পারে। ঈদের এক মাস অতিবাহিত হলেও এ নিয়ে নতুন কোনও তৎপরতা নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তরের কয়েকজন নেতা।

বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। যদিও বিভিন্ন কারণে তা যথাসময়ে হতে পারেনি। সর্বশেষ ষষ্ঠ কাউন্সিল হয়েছে ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। এবারে হওয়ার কথা সপ্তমবারের মতো।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ায় গঠনতন্ত্রের ৭(গ) ধারা অনুযায়ী ৮ বছর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা তারেক রহমান। তবে গত ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর গত ৯ জানুয়ারি স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তিনি ভারমুক্ত হয়ে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান।

আর মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন ২০১৬ সালের কাউন্সিলে। তিনিও বর্তমানে আগের দায়িত্বেই রয়েছেন। এ বছরের শেষ নাগাদ অথবা আগামী বছরের শুরুতে কাউন্সিল হতে পারে বলে জানা গেছে।

শিগগিরই আসছে কর্মসূচি!

সম্প্রতি বিএনপির বিভিন্ন শাখা, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের নিয়ে বৈঠক করেছেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মূলত দলীয় কাজকে গতিশীল করতেই এই বৈঠক বলে জানা গেছে। সেখানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ শীর্ষ নেতারা।

অন্য নেতাদের সঙ্গে সেই বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি জানান, নির্বাচনের পর দলীয় কর্মকাণ্ড কিছুটা কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে এই সময়ে আমাদের মাঠ পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী অলস সময় কাটাচ্ছেন। এটা নিয়ে দলের শীর্ষ নেতারাও কিছুটা উদ্বিগ্ন। তাই সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার ও নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করতে শিগগিরই নতুন কর্মসূচি ঘোষণার তাগিদ দেওয়া হয়।

‘স্থবিরতা নেই, সময় দিতে হবে’

বিএনপিতে স্থবিরতা নেমেছে এমনটি মানতে নারাজ দলের নেতারা। তাদের মতে, সরকারের মেয়াদ বেশি দিন হয়নি। তাই কিছুটা সমন্বয়হীনতা কাজ করতে পারে। তাই বলে দলীয় কাজ একেবারেই হয়নি সেটি বলা যাবে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ''বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার সব কিছু তছনছ করে গেছে। আমাদের দলীয় প্রধানসহ শীর্ষ নেতারা সরকারের দায়িত্বে রয়েছেন। তাই প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজ ও নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। তাই দলকে হয়তো কিছুটা সময় কম দিতে পারেন। যদিও আমাদের সাংগঠনিক কাজ ঠিকই হচ্ছে।''

তিনি বলেন, ''পুরোপুরি সাংগঠনিক কাজ বেগবান করতে আরও সময় দিতে হবে।'' তিনি জানান, দল গোছানোর কাজে দলের শীর্ষ নেতারা নিরলস কাজ করছেন। দলের কাউন্সিলের বিষয়ে দুদু জানান, এ বছরের শেষের দিকে করার প্রস্তুতি নিয়ে কাজ এগোচ্ছে। কোনও কারণে না হলে আগামী বছরের শুরুতে কাউন্সিল হবে।