আওয়ামী লীগের দাবি: ২০ মাসে লক্ষাধিক মিথ্যা মামলা, পুলিশ বলছে 'প্রপাগান্ডা'
আওয়ামী লীগের দাবি: ২০ মাসে লক্ষাধিক মিথ্যা মামলা

আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে লক্ষাধিক মামলা: দলীয় দাবি বনাম পুলিশের বক্তব্য

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পরবর্তী মাত্র ২০ মাসের মধ্যে সারাদেশে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে লক্ষাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে দলটি। যদিও সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান উপস্থাপন করতে পারেনি আওয়ামী লীগ, তবে তারা এসব মামলাকে প্রতিহিংসামূলক ও মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অন্যদিকে, পুলিশের পক্ষ থেকে এই অভিযোগকে 'প্রপাগান্ডা ও অবাস্তব' বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, যা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

বিএনপির তথ্য ও আওয়ামী লীগের পাল্টা অভিযোগ

বিএনপির প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী, ২০০৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মোট ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৮৩টি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। বিএনপি নেতাদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে দায়েরকৃত এসব মামলার প্রায় সবকটিই ছিল মিথ্যা ও হয়রানিমূলক। তবে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পাল্টা অভিযোগ উঠেছে যে, বর্তমানে দলটির প্রায় ১০ হাজার নেতা-কর্মীর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না, যাদের মধ্যে অনেকে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নিখোঁজ নেতাকর্মী ও মামলার বিস্তারিত

আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে হত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি ও সহিংসতাসহ বিভিন্ন ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে অসংখ্য মামলা দেওয়া হয়েছে। দলীয় নেতাদের মতে, এসব মামলা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও প্রতিহিংসামূলক। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, 'দুই থেকে আড়াই হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে এবং প্রায় ৫ লাখের ওপরে মামলা দায়ের করা হয়েছে'। তার মতে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেই সাড়ে ৬০০টির বেশি মামলা রয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য ও সহিংসতার পরিসংখ্যান

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইআরএসএস) তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসে ১ হাজার ৪১১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় কমপক্ষে ১৯৫ জন নিহত হয়েছেন। এই নিহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৬ জন নেতাকর্মী রয়েছেন, অন্যদিকে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীদের ১৫৬ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ৪৫ জন সদস্য রয়েছেন। প্রতিটি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

কারাবন্দী ও নিখোঁজ নেতাকর্মীদের অবস্থা

বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শেখ জামাল হোসাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, মহানগর ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের ১০ হাজারেরও বেশি নেতা-কর্মী বর্তমানে নিখোঁজ রয়েছেন'। তার দাবি অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় আড়াই হাজারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, তবে বাকি ব্যক্তিদের পরিবারগুলো এখনও তাদের খুঁজে পায়নি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত চার লাখের বেশি নেতা-কর্মী কারাবরণ করেছেন, যাদের মধ্যে দেড় লাখ জামিনে মুক্তি পেলেও বাকিরা কারাগারে মানবেতর অবস্থায় রয়েছেন।

সরকারি বক্তব্য ও পুলিশের প্রতিক্রিয়া

গত ১ এপ্রিল সংসদ অধিবেশনে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কতগুলো হয়রানিমূলক ও মিথ্যা মামলা করা হয়, তার পরিসংখ্যান সরকারিভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। তিনি উল্লেখ করেন, বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ২০০৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৮৩টি মামলা হয়েছিল, যার মধ্যে ২৩ হাজার ৮৬৫টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। অবশিষ্ট মামলাগুলো প্রত্যাহারের জন্য একটি ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের গণআন্দোলনসহ বিভিন্ন সময়ে হেলমেট বাহিনীর নামে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে কিছু মামলা হয়েছে, তবে 'লাখ লাখ মামলা হয়েছে বলে যে কথা তারা বলছেন, সেটা অবাস্তব ও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন'

এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিষয়টি সংসদে পাস করার প্রসঙ্গে আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম মন্তব্য করেন, 'এটা ফ্যাসিস্ট ইউনুস সরকার করেছিল, যা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অসাংবিধানিক'। তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যেকোনো অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করে গণ আন্দোলন গড়ে তুলবে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মামলার এই ঢেউ দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।