কুষ্টিয়ায় কোমলপানির ছিপি নিয়ে সংঘর্ষ: আওয়ামী লীগ-বিএনপি সংঘর্ষে ৭ আহত, বাড়িতে অগ্নিসংযোগ
কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলায় একটি কোমলপানির বোতলের ছিপি ছোড়াকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অনুসারীদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ অন্তত সাত জন আহত হয়েছেন এবং একজনের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। রবিবার বিকাল ৫টা থেকে রাত দেড়টা পর্যন্ত উপজেলার কয়া ইউনিয়নের বেড় কালোয়া জামে মসজিদ এলাকায় এ সহিংসতা সংঘটিত হয়।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা নদীতে মাছ ধরা, অবৈধ বালু উত্তোলন, চাঁদা তোলা ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি রাশিদুল ইসলাম ও বেড় কালোয়া জেলেপাড়ার সরদার আওয়ামী লীগ কর্মী ইয়ারুল শেখ পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল। রবিবার সকালে ইয়ারুল শেখের সমর্থক রতন শেখ কোমল পানীয় পান করার পর বোতলের ছিপি ছোড়েন। ছিপিটি গ্রামের ‘ক্যাসেট’ নামের এক ব্যক্তির মাথায় লাগলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং মারধরের ঘটনা ঘটে।
বিকালে রতন শেখ, ইয়ারুল শেখ, নাসের উদ্দিনসহ তাদের লোকজন বেড় কালোয়া জামে মসজিদ এলাকায় দেশীয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়। এতে বিএনপি নেতা রাশিদুল ইসলামের অন্তত সাত জন অনুসারী গুলিবিদ্ধ হন। আহতদের মধ্যে রাধাগ্রামের মো. রাব্বি (২২), আজম শেখ (৫৪), মো. ওবাইদুল্লাহ (৩০), জনি শেখ (২০), বেড় কালোয়া গ্রামের শারুফ শেখ (২০), জাহাঙ্গীর আলম (৪৫) ও মো. শফিউদ্দিন (৬৫) রয়েছেন। রাব্বি, জনি, আজম ও শারুফ গুলিবিদ্ধ হওয়ায় কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
অগ্নিসংযোগ ও ভিডিও ক্লিপের প্রচার
রাত দেড়টার দিকে হঠাৎ ইয়ারুল শেখের সমর্থক রতন শেখের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় লোকজন আগুন দেখতে পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেন। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও রতনের বসতঘর ও আসবাব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তবে আগুনের সূত্রপাত এখনো অস্পষ্ট এবং সে সময় বাড়িতে কেউ ছিল না বলে জানা গেছে।
হামলার কয়েকটি ভিডিও ক্লিপ রবিবার রাতেই ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে। ভিডিওতে দেখা যায়, কৃষিজমিতে অর্ধশতাধিক মানুষ ছোটাছুটি করছেন, অনেকের মাথায় হেলমেট এবং হাতে ঢাল, সরকি, লাঠিসোঁটা ও আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে।
আহতদের বক্তব্য ও চিকিৎসা অবস্থা
আহত মো. রাব্বি বলেন, ‘রবিবার সকালে বোতলের ছিপি ছোড়া নিয়ে প্রতিপক্ষের রতনের সঙ্গে হাতাহাতি হয়েছিল। বিকালে রতন সন্ত্রাসী ইয়ারুলসহ তার বাহিনী দিয়ে গুলি করেছে। আমার বুক, হাত, পা-সহ সবখানে অসংখ্য গুলি লেগেছে।’ জনি শেখ জানান, ‘আমরা ১০-১২ জন মসজিদের পাশের মাঠে আড্ডা দিচ্ছিলাম। তখন জেলেপাড়ার সরদার সন্ত্রাসী ইয়ারুল শেখ, নাসের উদ্দিন, সোহেলসহ কয়েক শ সন্ত্রাসী দেশীয় অস্ত্র ও পিস্তল, শটগান নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়।’
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা হোসেন ইমাম জানান, গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে চার জন ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে রাব্বি নামের একজনের বুকে গুলি লাগায় তাকে ঢাকায় রেফার্ড করা হয়েছে। অন্য আহতরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
বিএনপি নেতার অভিযোগ ও পুলিশের বক্তব্য
বিএনপি নেতা রাশিদুল ইসলামের পক্ষের আলম শেখ জানান, সামান্য ঘটনা নিয়ে রতন অন্য গ্রামের সন্ত্রাসীদের এনে হামলা চালিয়েছে। রাশিদুল ইসলাম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ কর্মী ও পদ্মায় নদীতে পুলিশ হত্যা মামলার প্রধান আসামি ইয়ারুল, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীরের ভাই সোহেল রানা, সন্ত্রাসী নাসের উদ্দিনরা আমার লোকদের ওপর অতর্কিত হামলা করেছেন। এতে সাত জন গুলিবিদ্ধ হন। মামলার প্রস্তুতি চলছে।’
কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিন বলেন, ‘পূর্বশত্রুতার জেরে হামলা ও গুলির ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং পুলিশ নজরদারি জোরদার করেছে বলে জানা গেছে।



