জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন: প্রবীণ-নবীন সমন্বয়
পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তার সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করেছে। দলের তিন স্তরের নীতিনির্ধারণী পর্ষদ—কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা, কর্মপরিষদ ও নির্বাহী পরিষদে সদস্যসংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, নতুন কাঠামোয় পুরোনো রক্ষণশীল ধারার নেতা ও নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিদের একসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, যাতে অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতাদের সামনে নিয়ে আসা যায়।
নায়েবে আমির পদে এ টি এম আজহারুল ইসলামের অবস্থান
পুনর্গঠনের একটি বিশেষ দিক হলো নায়েবে আমির পদে এ টি এম আজহারুল ইসলামকে ১ নম্বরে রাখা। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রায় ১৩ বছর কারাবন্দী থাকার পর মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত এই নেতা ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর খালাস ও মুক্তি পান। গত বছরের ২৩ নভেম্বর কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার প্রথম অধিবেশনে তাঁকে নায়েবে আমির করা হয়। আগে নায়েবে আমির ছিলেন তিনজন—মজিবুর রহমান, সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের ও আ ন ম শামসুল ইসলাম। এবার চারজনকে নায়েবে আমির করা হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডাদেশ থেকে খালাস পেয়ে রাজনীতিতে ফিরে এ টি এম আজহারুল ইসলাম রংপুর-২ আসন থেকে এবার সংসদ সদস্যও হন। ২০১০ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দলের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ গ্রেপ্তার হলে তখন এ টি এম আজহারুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল করা হয়। পরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়। কারাবন্দী অবস্থায় দল তাঁকে ২০১৭-১৯ মেয়াদে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল পদে রাখে।
তৃতীয় মেয়াদে আমির শফিকুর রহমান ও অন্যান্য নেতৃত্ব
তৃতীয় মেয়াদে জামায়াতের আমির হয়েছেন শফিকুর রহমান। আবারও সেক্রেটারি জেনারেল মনোনীত হয়েছেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দলের আমির সেক্রেটারি জেনারেল মনোনীত করেন। আগের কমিটির সাতজন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলকে এবারও বহাল রাখা হয়েছে।
নির্বাহী পরিষদে নারী সদস্যের অনুপস্থিতি
২১ সদস্যের নতুন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে যুক্ত হয়েছেন তরুণ দুই নেতা—ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ এবং ঢাকা মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি মোহাম্মদ রেজাউল করিম। মাসুদ এবার পটুয়াখালী থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন; রেজাউল লক্ষ্মীপুরের একটি আসনে পরাজিত হয়েছেন। নির্বাহী পরিষদের সদস্যসংখ্যা ১৯ থেকে বাড়িয়ে এবার ২১ করা হয়েছে। নায়েবে আমির আ ন ম শামসুল ইসলামকে এবার নির্বাহীতে রাখা হয়নি। তাঁর স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলামকে।
তবে বরাবরের মতো এবারও নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী সদস্য নেই। জামায়াতের নির্বাহী পরিষদকে দলের দৈনন্দিন কার্যক্রম এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নকারী সর্বোচ্চ পর্ষদ বলা হয়। নবগঠিত নির্বাহী পরিষদের আটজন এবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁরা হলেন এ টি এম আজহারুল ইসলাম, মুজিবুর রহমান, সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, রফিকুল ইসলাম খান, সাইফুল আলম খান (মিলন), মো. ইজ্জত উল্লাহ, নুরুল ইসলাম বুলবুল ও শফিকুল ইসলাম মাসুদ।
জামায়াতের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সিদ্ধান্তসমূহের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য অনধিক ২১ সদস্যের সমন্বয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ গঠিত হয়।
কর্মপরিষদে নারী সদস্যদের নাম প্রকাশ
জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির নাম হচ্ছে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দলের আমিরকে সহযোগিতা করার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক নায়েবে আমির, একজন সেক্রেটারি জেনারেল, প্রয়োজনীয় সংখ্যক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, বিভাগীয় সেক্রেটারি এবং অন্য সদস্যদের সমন্বয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ গঠিত হয়। আগের কর্মপরিষদে সদস্যসংখ্যা ছিল ৭১, যাতে নারী সদস্য ছিলেন ১৫ জন। এবার সেটি ৮৮ সদস্যের করা হয়েছে, তাতে ২১ জন নারী সদস্য রয়েছেন।
২২ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের তালিকা প্রকাশ করেছে জামায়াত। তাতে সাবেক দুই সংসদ সদস্য এবং নবনির্বাচিত ১৫ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। কর্মপরিষদে শিবিরের সাবেক সভাপতি জাহিদুর রহমান ও আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরের মতো নবীনদের স্থান দেওয়া হয়েছে। এবার প্রথমবারের মতো কর্মপরিষদে থাকা নারী সদস্যদের নাম প্রকাশ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, নারী সদস্যদের বেশির ভাগই জামায়াতের মহিলা বিভাগের এবং ছাত্রজীবনে ইসলামী ছাত্রী সংস্থার শীর্ষ পর্যায়ের নেতা ছিলেন। এর মধ্যে দলের আমিরসহ দায়িত্বশীল নেতাদের স্ত্রী-কন্যাও আছেন। এত দিন নাম প্রকাশ না করার কারণ হিসেবে প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আগে নাম প্রকাশ করলে মামলা-হামলার আশঙ্কা ছিল, সে কারণে করা হয়নি। এবারই প্রথম নারীদের নাম প্রকাশ করা হয়েছে।
অঞ্চল পরিচালক নিয়োগ ও নির্বাচন প্রক্রিয়া
এবারই প্রথম সারা দেশকে ১৪টি সাংগঠনিক অঞ্চলে ভাগ করে অঞ্চল পরিচালক নিয়োগ ও তাঁদের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি পাঁচ সদস্যের একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করে জ্যেষ্ঠ সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মাছুমকে প্রধান করা হয়েছে।
গত নভেম্বরে টানা তৃতীয়বারের মতো তিন বছরের জন্য আমির নির্বাচিত হন শফিকুর রহমান। আমির নির্বাচিত হন শপথধারী সদস্য বা রুকনদের প্রত্যক্ষ ভোটে। বর্তমানে সারা দেশে রুকনের সংখ্যা ১ লাখ ৩৩ হাজার। আমির পদে প্রার্থী নির্ধারণে রয়েছে পৃথক প্রক্রিয়া। মজলিশে শুরার সদস্যদের গোপন ভোটে আমির পদে তিনজনের একটি বাছাই তালিকা করা হয়। সেই তিনজনের নাম সারা দেশের রুকনদের জানানো হয়। পরে রুকনরা গোপন ব্যালটে ভোট দিয়ে আমির নির্বাচন করেন। সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্তকে নির্বাচন কমিশন আমির ঘোষণা করে।
দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, মজলিশে শুরার সদস্য নির্বাচন হয় তিন ধাপে। প্রথমে সারা দেশের রুকনরা ভোটের মাধ্যমে শুরা সদস্য নির্বাচন করেন। দ্বিতীয় ধাপে নির্বাচিত শুরা সদস্যরা গোপন ব্যালটে আরও ৩০ জন কেন্দ্রীয় নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করেন। তৃতীয় ধাপে প্রথম ধাপে নির্বাচিত সদস্যসংখ্যার পাঁচ ভাগের এক ভাগ সদস্য আমির গঠনতান্ত্রিক ক্ষমতাবলে যুক্ত করেন। সাধারণত আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি এবং ভোটে নির্বাচিত হতে না পারা যোগ্য নেতাদের এ পর্যায়ে যুক্ত করা হয়।
সাংগঠনিক শক্তিশালীকরণ ও বিতর্ক
গত ২৩ নভেম্বর কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার প্রথম অধিবেশনে এ টি এম আজহারুল ইসলামকে নায়েবে আমির করা হয়। জাতীয় নির্বাচনসহ সার্বিক পরিস্থিতির কারণে তখন পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়নি; প্রায় তিন মাস পর নায়েবে আমির, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, নির্বাহী পরিষদ, কর্মপরিষদ ও মজলিশে শুরা গঠন করা হয়। সব স্তরের কমিটিতে প্রবীণ ও নবীন নেতৃত্বের সমন্বয় করে জামায়াত সাংগঠনিক বিস্তার ও কাঠামোগত শক্তিশালীকরণের বার্তা দিচ্ছে।
তবে নির্বাহী পরিষদে নারী প্রতিনিধিত্ব না থাকা এবং মহিলা বিভাগের পৃথক কাঠামো—দলের নীতিগত অবস্থান বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিতর্কের অবকাশ থেকে যাচ্ছে। জামায়াতের মহিলা বিভাগ সাংগঠনিকভাবে পৃথকভাবে কাজ করে এবং সরাসরি আমির বা তাঁর মনোনীত নেতার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, মহিলা বিভাগ আলাদা কেন, এখানে শরিয়াহর প্রশ্ন আছে। ধর্মীয়ভাবে নারী ও পুরুষের পৃথক সত্তা রয়েছে। কিন্তু একে অপরের পরিপূরক। আবার নারীদের কাজের সহায়ক হচ্ছেন পুরুষ। এ কারণে নারী ও পুরুষের পার্থক্য রাখতে হয়।
