রমজান ঘিরে বিশেষ কৌশল হাতে নিয়েছে আওয়ামী লীগ, নিষেধাজ্ঞা অমান্যে তৎপরতা
অন্তর্বর্তী সরকারের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রমজান মাসে আওয়ামী লীগের তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর আগস্টে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও দলটি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চলেছে।
নিষেধাজ্ঞা অমান্যে দলীয় কার্যক্রম
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, রমজান মাসকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ একটি বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই পরিকল্পনার আওতায় দলটি ইফতার মাহফিল ও গরিব-দুঃখীদের মধ্যে ইফতার সামগ্রী বিতরণের নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে দলীয় কার্যালয় খুলেছে। বুধবার দেশের বহু স্থানে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম চোখে পড়ার মতো ছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর রাজধানীসহ সারাদেশে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। তবে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটদানের সময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা স্থানীয়ভাবে প্রকাশ্যে আসার সুযোগ পেয়েছেন। অনেকেই জামায়াত জোট বা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষে কাজ করেছেন, যার ফলে এখন অন্যান্য দলগুলো আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে বাধা দিচ্ছে না।
দেশব্যাপী দলীয় তৎপরতা
নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের জেলা ও মহানগর কার্যালয়ের সামনে ব্যানার টানানো হয়েছে এবং দলীয় স্লোগান দেওয়া হয়েছে। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। চট্টগ্রামে যুবলীগের উদ্যোগে কারাবন্দিদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ইফতার সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে এবং ছাত্রলীগের উদ্যোগে মহানগর আওয়ামী লীগের অফিস উদ্বোধন করা হয়েছে।
ময়মনসিংহের তারাকান্দায় কর্মী-সমর্থকদের জমায়েত হয়েছে। দিনাজপুরের পার্বতীপুরে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের উদ্যোগে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। শরীয়তপুরে ছাত্রলীগ ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে দলীয় কার্যালয় উন্মুক্ত করেছে। নোয়াখালীর টাউন হল মোড়ে জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের তালা ভেঙে ব্যানার টানানো হয়েছে।
কুড়িগ্রামে দলীয় কার্যালয়ে ব্যানার টানানো ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা ভাঙচুর চালিয়েছে। রাজবাড়ীতে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিবের ছবি টানানো হয়েছে। হবিগঞ্জে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে দলীয় কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
বিভিন্ন এলাকায় ঘটনাবলি
- নোয়াখালীতে দলীয় কার্যালয় খোলা হয়েছে।
- বরিশালে ‘শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে’ শীর্ষক ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।
- চাঁপাইনবাবগঞ্জে জেলা ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
- লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লায় যুবলীগের উদ্যোগে ইফতার সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
- চট্টগ্রামে সাবেক ছাত্রলীগ নেতার উদ্যোগে ইফতার সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
- কুমিল্লার বুড়িচংয়ে দলীয় কার্যালয় উন্মুক্ত করা হয়েছে।
- নোয়াখালীর সেনবাগে ছাত্রলীগের উদ্যোগে ইফতার সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
- নওগাঁ আত্রাই উপজেলা দলীয় কার্যালয় খোলা হয়েছে।
- উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে পোস্টারিং করা হয়েছে।
- পটুয়াখালী দশমিনায় দলীয় কার্যালয়ের উদ্বোধন করা হয়েছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে দলীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলন করে ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা হয়েছে। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের অফিস খুলে ব্যানার টানানো হয়েছে। দিনাজপুর সদরে দলীয় কার্যালয় খুলে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। খুলনায় দলীয় কার্যালয়ে শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার ছবি টানানো হয়েছে এবং ফুলের মালা পরানো হয়েছে।
বরগুনার বেতাগীতে দলীয় কার্যালয়ে শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার ছবি পুনঃস্থাপন করা হয়েছে এবং সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য ছাত্রলীগের সাবেক-বর্তমান নেতারা উপস্থিত হয়েছেন। পঞ্চগড়ের চাকলাহাটে দলীয় কার্যালয়ের তালা খুলে স্থানীয় নেতাকর্মীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।
পুলিশের সতর্কতা ও গ্রেফতার
পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, "ট্রানজিশনাল পিরিয়ডের সুযোগ নিতে চেয়েছিল আওয়ামী লীগ। ভোটের পর থেকে নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের দিন পর্যন্ত তারা বেশি তৎপর ছিল। এখন আমরা এ বিষয়ে সজাগ আছি। আশা করছি, তাদের অপতৎপরতা সফল হবে না।"
তিনি আরও বলেন, "নিষিদ্ধ দলকে আমার কোনো কার্যক্রম চালাতে দেব না। দিনাজপুর, নোয়াখালী ও নারায়ণগঞ্জ থেকে এরই মধ্যে আমরা ১১ জনকে গ্রেফতার করেছি।" আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন সরকারের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছে, তবে এখনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের তৎপরতা সম্পর্কে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা সরকারকে অবগত করেছে, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এই অবস্থায় রমজান মাস জুড়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
