জোনায়েদ সাকির রাজনৈতিক যাত্রায় নতুন মাইলফলক
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি গতকাল মঙ্গলবার সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের পরপরই অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্তি পেয়েছেন। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠনের পর মিত্রদলগুলোর নেতাদের মধ্যে জোনায়েদ সাকিকেই এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অভূতপূর্ব সাফল্য
বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করে নতুন সরকার গঠন করেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া–৬ (বাঞ্ছারামপুর) আসনে বিএনপির মিত্রদলগুলোর জন্য ছাড় দেওয়া আসনগুলোর মধ্যে একটি থেকে জোনায়েদ সাকি প্রার্থী হন। দলীয় প্রতীক মাথাল নিয়ে তিনি ৯৫ হাজার ভোট পেয়ে বিজয়ী হন, যেখানে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে তাঁর ভোটের ব্যবধান ছিল ৫৫ হাজার।
এটি ছিল জোনায়েদ সাকির প্রথম সংসদ নির্বাচনী বিজয়। এর আগে ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মেয়র পদে এবং ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসনে তিনি প্রার্থী হয়েছিলেন, কিন্তু সেসময় জয়ী হতে পারেননি। প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়াটা তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।
তিন দশকের রাজনৈতিক পথচলা
জোনায়েদ সাকির রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময়। তিনি তখন বদরুদ্দীন উমরের নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনে যুক্ত ছিলেন। ১৯৯৮ সালে তিনি এই সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হন।
২০০২ সালে গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট ভেঙে গণসংহতি আন্দোলন গঠিত হলে জোনায়েদ সাকি এই দলের দায়িত্ব নেন। ২০১৫ সালে দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। দীর্ঘ সময় ধরে রাজপথকেন্দ্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি নিজস্ব একটি রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তোলেন।
বিএনপির সঙ্গে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা
প্রাথমিকভাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বাম দলগুলোর জোটে থাকলেও পরবর্তীতে গণসংহতি আন্দোলনের বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ২০২২ সালে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপির নেতৃত্বে যুগপৎ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন জোনায়েদ সাকি। এরপর তিনি বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্য গড়ে তোলেন, যা শেষ পর্যন্ত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সাফল্য বয়ে আনে।
ব্যক্তিগত জীবন ও শিক্ষাগত যোগ্যতা
জোনায়েদ সাকির জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকার বাসাবো এলাকায়। সরকারি কর্মকর্তার ছেলে হিসেবে তাঁর শৈশব কাটে এই এলাকাতেই। মাধ্যমিক পাসের পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে ভর্তি হন, কিন্তু রাজনীতিতে সক্রিয়তার কারণে সেখানে তাঁর পড়াশোনা অসমাপ্ত থাকে। পরে তিনি অন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। হলফনামায় তিনি তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা 'বিএ' হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
জোনায়েদ সাকির স্ত্রী তাসলিমা আক্তারও রাজনীতিতে সক্রিয়। তিনিও গণসংহতি আন্দোলনের সভাপতি ছিলেন এবং বর্তমানে এই দলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এবারের নির্বাচনে তিনি মাথাল প্রতীকে ঢাকা–১২ আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন, তবে জামানত হারিয়েছেন।
আর্থিক অবস্থা ও সম্পদের বিবরণ
নির্বাচনী হলফনামায় জোনায়েদ সাকি তাঁর পেশা প্রকাশক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি তাঁর বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন প্রায় ৮ লাখ টাকা। স্থাবর সম্পত্তি হিসেবে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকার সম্পদ থাকার কথা লিখেছেন তিনি।
এছাড়াও তিনি ১১ একর জমির মালিকানা স্বীকার করেছেন, যদিও এই জমির মূল্য 'অজানা' বলে উল্লেখ করেছেন। ২০২৫–২৬ করবর্ষের জন্য তিনি তাঁর মোট সম্পদের মূল্যমান দেখিয়েছেন ৪৬ লাখ ৬২ হাজার টাকা।
নতুন সরকারে ভূমিকা ও প্রত্যাশা
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে জোনায়েদ সাকির উপর এখন দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বর্তাবে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমী খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই দুই দপ্তরের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, যার অধীনে জোনায়েদ সাকি কাজ করবেন।
তিন দশকের বেশি সময়ের নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক সংগ্রামের পর মন্ত্রিসভায় পৌঁছানো জোনায়েদ সাকির জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তাঁর এই নিযুক্তি বিএনপি ও তার মিত্রদলগুলোর মধ্যে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
