দীপেন দেওয়ানের রাজনৈতিক উত্থান: প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই মন্ত্রীত্ব
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে গতকাল মঙ্গলবার বিএনপি নতুন সরকার গঠন করে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁর সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের নিয়ে শপথ নেন। এই সরকারে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন দীপেন দেওয়ান, যিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। ৬৩ বছর বয়সী দীপেন দেওয়ান এবারের নির্বাচনে পার্বত্য রাঙ্গামাটি আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন এবং নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে সর্বাধিক ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন।
নির্বাচনী সাফল্য ও পারিবারিক পটভূমি
দীপেন দেওয়ান নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে ১ লাখ ৭০ হাজার ৩২২টি ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন, যা এই নির্বাচনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তাঁর বাবা সুবিমল দেওয়ান রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপজাতিবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন, যা দীপেন দেওয়ানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে সমৃদ্ধ করে। ১৯৬৩ সালে রাঙ্গামাটি পৌরসভার কলেজগেট এলাকার মন্ত্রিপাড়ায় সুবিমল দেওয়ান ও মুহিনি দেওয়ানের ঘরে তাঁর জন্ম হয়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে জুডিশিয়াল সার্ভিসে যোগ দেন।
রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও চ্যালেঞ্জ
২০০৫ সালে যুগ্ম জেলা জজের চাকরি ছেড়ে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন এবং ২০১০ সালে রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি হন। ২০১৬ সাল থেকে তিনি কেন্দ্রীয় বিএনপির সহধর্মবিষয়ক সহসম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। এখন পার্বত্যাঞ্চলের সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পার্বত্য চুক্তি নিয়ে কীভাবে এগোবেন। এই চুক্তির ফসল পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়, যা দীর্ঘ দুই দশকের সহিংসতার পর ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বরের পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে আপাতশান্তি এনেছিল।
তবে পুরোপুরি শান্তি অধরাই থেকে গেছে এবং এখনো সহিংসতায় রক্ত ঝরছে পাহাড়ে। ২০২৪ এবং ২০২৫ এর সেপ্টেম্বর মাসে দুইবার সহিংসতায় অন্তত ৬ জনের প্রাণহানি হয়, যা পার্বত্য চুক্তির পর এই মাত্রায় সহিংসতা হিসেবে দেখা যায়নি। পার্বত্য চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অনেক ধারাই এখনো পূরণ হয়নি বলে অসন্তোষ রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ওই চুক্তি সম্পাদনকারী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিতে (জেএসএস)।
বিএনপির ইশতেহার ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বিএনপি তাদের এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে, তারা পার্বত্য চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন করবে। এর ধরন কেমন হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। আবার সেই উদ্যোগ পাহাড়ের চুক্তি সম্পাদনকারী জেএসএস কতটা গ্রহণ করবে, সেই প্রশ্নও রয়ে গেছে। পাহাড়ে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এ ধরনের নতুন কোনো উদ্যোগ জটিলতা বাড়াবে কি না, সেই প্রশ্নও থাকছে।
আর্থিক অবস্থা ও হলফনামা
নির্বাচনী হলফনামায় দীপেন দেওয়ান তাঁর বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা। তিনি ১ কোটি ৭৭ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদের কথা উল্লেখ করেন এবং স্থাবর সম্পদের অর্জন মূল্য দেখিয়েছেন ৫৬ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। এই আর্থিক তথ্যগুলো তাঁর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দিকটি তুলে ধরে।
দীপেন দেওয়ানের মন্ত্রীত্ব লাভ পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি ও উন্নয়নের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে, তবে তা নির্ভর করবে কীভাবে তিনি পার্বত্য চুক্তির মতো জটিল বিষয়গুলো মোকাবেলা করেন তার উপর।
