ভোটের ফল প্রকাশের ঠিক আগের দিন বেশ ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। শনিবার রাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে ইন-এর সঙ্গে এক ফোনালাপে তার এই মেজাজ স্পষ্ট ধরা পড়ে। সপ্তাহের পর সপ্তাহ তীব্র গরম আর ধুলোবালির মধ্যে নির্বাচনি প্রচারণার পর তার চারপাশের পরিবেশ ছিল বেশ হালকা। ফোনালাপের সময় নেপথ্যে মৃদু কথাবার্তা, মাঝেমধ্যে হাসির আওয়াজ এবং পাশ থেকে কাউকে সেদ্ধ চিকেন সুপের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নিয়ে আলোচনা করতেও শোনা যায়।
টানটান উত্তেজনার মধ্যেও শান্ত মেজাজ
পশ্চিমবঙ্গে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর গত কয়েক দিন ধরে টানটান উত্তেজনা চলছে। সাধারণত ভোট গ্রহণ শেষ ও ফল প্রকাশের মধ্যবর্তী সময়টা শান্ত থাকলেও, এবার পরিস্থিতি মোটেও তেমন ছিল না। ইভিএম কারচুপির অভিযোগ নিয়ে শোরগোল, কয়েকটি আসনে পুনর্নির্বাচন এবং কারচুপির বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'জীবন-মরণ লড়াই'-এর আবহ যখন বিন্দুমাত্র কমেনি, তখনও শমীক ভট্টাচার্যকে বেশ শান্ত মনে হচ্ছে। তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, 'তিনি (মমতা) এবার কিছুই করতে পারবেন না।'
বর্জনের নির্বাচন
এই আত্মবিশ্বাস কি বিজেপিপন্থি হাওয়া নাকি ক্ষমতাসীন-বিরোধী মনোভাব থেকে আসছে, জানতে চাইলে রাজ্য বিজেপি সভাপতি একে 'বর্জনের নির্বাচন' বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, 'শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে বেকারত্ব সব বিষয়ই তৃণমূলের পতনে ভূমিকা রাখছে।'
দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মোকাবিলা
তবে তার এই আপাত শান্ত মেজাজ এসেছে গত এক বছর ধরে গভীর কোন্দলে বিভক্ত একটি দলকে পরিচালনা করার পর। এক বছর আগে যখন শমীক ভট্টাচার্য পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির দায়িত্ব নেন, তখন তিনি একটি বিভক্ত দলের নেতৃত্ব পেয়েছিলেন, যে দলটিতে উপদলীয় কোন্দল এবং একাধিক ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল। দলের ভেতরের এই লড়াই গোপন কোনও বিষয় ছিল না। এমনকি সাবেক এক রাজ্য সভাপতি, যিনি এবার প্রার্থীও হয়েছেন, তিনি ২০২৪ সালে এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন যে লোকসভা নির্বাচনে তার সম্ভাবনা ভেস্তে দিতে দলের ভেতর থেকেই চেষ্টা চালানো হয়েছিল।
উত্থানের পথ
অবশ্য শমীক ভট্টাচার্যের এই উত্থান হঠাৎ করে হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকা এই নেতা তৃণমূল পর্যায় থেকে নীরবে উঠে এসেছেন এবং দলের প্রধান মুখপাত্র হিসেবে একজন পরিমিত অথচ তীক্ষ্ণ বক্তা হিসেবে সুনাম অর্জন করেছেন।
বিজেপির বাংলা ইউনিটের প্রধান হওয়ার আগের মাসগুলোতে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের গতি আরও বৃদ্ধি পায়। ২০২৪ সালে রাজ্যসভার সদস্য পদ লাভ, ২০২৫ সালে 'অপারেশন সিঁদুর' প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে লন্ডনে গিয়ে দেশাত্মবোধক বক্তৃতা এবং দেশে ফেরার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবন সফর। এর কয়েক সপ্তাহ পরেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক রাজনৈতিক মুহূর্তে তার হাতে রাজ্য ইউনিটের লাগাম তুলে দেওয়া হয়।
সংশয় ও পরীক্ষা
অবশ্য এরপরই তার ওপর সংশয় তৈরি হয়। তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) প্রতিদ্বন্দ্বীদের মতে, ভট্টাচার্যের নিয়োগের ফলে বিজেপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটে যাওয়ার সম্ভাবনা কম ছিল। সে সময় তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ শমীক ভট্টাচার্যের 'ভদ্র আচরণের' প্রশংসা করলেও বলেছিলেন, 'সুকান্ত মজুমদার, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং সাবেক সাংসদ দিলীপ ঘোষের নেতৃত্বাধীন শিবিরগুলোর মধ্যে প্রতিনিয়ত লড়াই চলছে। শমীক ভট্টাচার্যের পক্ষে বিজেপিকে ঐক্যবদ্ধ রাখা কঠিন হবে।'
এক বছর পর, যখন ফল প্রায় দোরগোড়ায়, তখন সেই প্রাথমিক সংশয়গুলোর পরীক্ষা হতে চলেছে। বেশিরভাগ বুথফেরত জরিপে (এক্সিট পোল) পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যে ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে বিজেপি এক ঐতিহাসিক ফল করতে চলেছে এবং বেশ কয়েকটি জরিপ দলটিকে স্পষ্ট এগিয়ে রেখেছে। এই পূর্বাভাস সত্যি হোক বা না হোক, ২০২১ সালের তুলনায় দলটি এবার আসন বাড়াতে এবং পশ্চিমবঙ্গে তাদের এযাবৎকালের সেরা বিধানসভা পারফরম্যান্স করতে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা
নির্বাচন শেষ ও ফল সামনে রেখে ভট্টাচার্য বলেন যে সাংগঠনিক প্রধান হিসেবে তিনি কোনও বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হননি। এর মাধ্যমে এক বছর আগে দায়িত্ব নেওয়ার পর দলের বিবদমান গোষ্ঠীগুলোকে তিনি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন কি না, এমন প্রাথমিক সংশয়ের নীরব জবাব দিলেন তিনি। তিনি বলেন, 'এটি শুরু থেকেই একটি দলগত কাজ ছিল। একমাত্র চ্যালেঞ্জ বলতে পারেন যে, একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রতিটি বুথে আমাদের এজেন্টদের বসিয়ে রাখা এবং তাদের মধ্যে নির্ভীকতা তৈরি করা। সে কাজে আমরা সফল হয়েছি।'
প্রচারণায় প্রধান মুখ
নিজে প্রার্থী না হলেও শমীক ভট্টাচার্য পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনি প্রচারণায় বিজেপির অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে আবির্ভূত হন। শুভেন্দু অধিকারীর পাশাপাশি তার ছবিও রাজ্যের বিভিন্ন আকারের ব্যানারে দেখা গেছে; যেখানে দিল্লির কেন্দ্রীয় মুখ হিসেবে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদি, অমিত শাহ ও বিজেপি সভাপতি নীতিন নবীন।
আত্মপরিচয় ও বাঙালি অস্মিতা
ভট্টাচার্য এই নির্বাচনকে আত্মপরিচয় এবং বাঙালি অস্মিতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পরিবর্তনের এই ডাক রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। রাজ্যের বাইরে ও বিদেশে থাকা বাঙালিরাও পরিবর্তন চেয়েছিলেন, যা তাদের গৌরব এবং 'আগে বাঙালি' আবেগ দ্বারা চালিত।
তিনি আরও বলেন, বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ কেবল রাজ্যের ভোটারদেরই নয়, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী বাঙালিদেরও ঐক্যবদ্ধ করেছে। এই নির্বাচনে প্রায় সবাই অংশ নিয়েছেন। শুধু বাংলার ভোটাররাই নন, যারা বাইরে থাকেন তারাও।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বিজেপি সরকার গঠন করলে বাংলাকে একটি বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা হবে উল্লেখ করে ভট্টাচার্য বলেন, 'আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো শ্রমিক, শিক্ষার্থী, পুঁজি এবং বিনিয়োগকারীদের চলে যাওয়া বন্ধ করা।' তিনি আরও বলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে তাদের অগ্রাধিকার হবে বাংলার অতিরিক্ত রাজনীতি কমিয়ে আনা এবং একটি অরাজনৈতিক সমাজ তৈরি করা, যা রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে নতুনভাবে রূপ দেবে।
আরএসএস প্রসঙ্গ
১৯৭০-এর দশকে আরএসএসের মাধ্যমে বিজেপিতে যুক্ত হওয়া ভট্টাচার্যকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সম্প্রতি মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানার নির্বাচনে যেমনটি দেখা গেছে, ঠিক সেভাবে পশ্চিমবঙ্গেও আরএসএস পর্দার আড়ালে কোনও ভূমিকা পালন করেছে কি না? তিনি এই সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলেন, আরএসএস বিজেপির নির্বাচনি কৌশলে হস্তক্ষেপ করে না।



