বগুড়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জনসভা: ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি
সোমবার (২০ এপ্রিল) বগুড়া শহরের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত এক বিশাল জনসভায় প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষ তাদের হারিয়ে যাওয়া ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি দাবি করেন, এক যুগের বেশি সময় ধরে মানুষের বাক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ তাদের রায় দিয়েছে এবং বিএনপিকে আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।
জনসভার পরিবেশ ও প্রধানমন্ত্রীর আগমন
বেলা পৌনে ৬টায় প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে এসে পৌঁছালে হাজারো সমর্থক মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। হাস্যোজ্জ্বল প্রধানমন্ত্রী হাত নেড়ে তাদের জবাব দেন। জেলা বিএনপি এই জনসভার আয়োজন করে। জনসভা শুরুর আগেই দুপুর থেকে ছোট ছোট মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা মাঠে জমায়েত হতে শুরু করেন এবং বিকাল ৩টার মধ্যে পুরো মাঠ প্রাঙ্গণ জনসমুদ্রে রূপ নেয়।
ভোটের অধিকার ও সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে বলেন, বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশের মানুষের বাক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং ভোটের অধিকার হরণ করা হয়েছিল। তিনি অভিযোগ করেন, উন্নয়নের নামে প্রতারণা ও লুটপাট করা হয়েছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সরকার গঠনের পর থেকে তার বাস্তবায়ন পর্যায়ক্রমে শুরু হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, বগুড়ার গাবতলীতে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে, যা দেশের মায়েদের স্বাবলম্বী করতে সহায়ক হবে। এছাড়া, কৃষক ভাইদের জন্য কৃষি কার্ড চালু করা হয়েছে এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, সরকার গঠনের প্রথম ১০ দিনের মধ্যে এই কাজ সম্পন্ন করে সারা বাংলাদেশে ১২ লাখ কৃষকের ঋণ মওকুফ করা হয়েছে।
জুলাই সংস্কার কমিশন ও রাজনৈতিক বিভ্রান্তি
জুলাই সংস্কার কমিশন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১১টি কমিশন গঠন করেছিল, যার মধ্যে সংবিধান, বিচার, স্বাস্থ্য ও নারী বিষয়ক কমিশন অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু রাজনৈতিক দল সংস্কার ও জুলাই সনদ নিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চাইছে, কিন্তু তারা নারীর স্বাধীনতা বা উন্নয়ন নিয়ে কথা বলে না।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বিএনপি জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দ ও অক্ষর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বাস্তবায়ন করবে। তবে তিনি বলেন, কিছু দল সংসদে ও সংসদের বাইরে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে, যেখানে তাদের ওষুধ, চিকিৎসা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে কথা বলা উচিত ছিল।
স্থানীয় ও জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা
প্রধানমন্ত্রী অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান নিয়ে বলেন, স্বল্প খরচে তরুণদের বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করা হয়েছে। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালু করার ঘোষণা দেন এবং আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন, যা কৃষকের ফসল রক্ষা ও খরা মৌসুমে পানির অভাব দূর করবে।
বগুড়ার স্থানীয় উন্নয়নের জন্য তিনি বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথের কাজ দ্রুত শুরু করা, বগুড়া বিমানবন্দরকে কার্গো বিমান ওঠানামার উপযোগী করে গড়ে তোলা এবং নবঘোষিত সিটি করপোরেশনকে পরিকল্পিত ও নান্দনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন।
সংস্কার ও গণতন্ত্রের অঙ্গীকার
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যখন স্বৈরাচারের ভয়ে অন্য দল সংস্কারের কথা বলতে সাহস পায়নি, তখন বিএনপি ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি দিয়েছিল। তিনি দাবি করেন, গত ১৬ বছরে দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যাংকিং ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং মেগা প্রজেক্টের নামে লুটপাট ও দুর্নীতি করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ৫ই আগস্ট দেশ স্বৈরাচারমুক্ত হওয়ার পর সংস্কার কমিশন গঠিত হয়েছে এবং বিএনপি স্বচ্ছ প্রস্তাবনা জমা দিয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গণতন্ত্রে মতের পার্থক্য থাকবে, কিন্তু লক্ষ্য হবে দেশের মানুষের উন্নয়ন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের পর বগুড়ায় এটিই তারেক রহমানের প্রথম জনসভা। এর আগে গত ২৯ জানুয়ারি একই মাঠে নির্বাচনি জনসভা করেছিলেন তিনি। জনসভায় তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন এবং জেলা বিএনপির নেতৃত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়।



