২০১৩ সালের মে মাসে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে পুলিশের হাতে নিহতদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে করা মামলায় দুই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল বাবুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই ঘটনা দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) বিচারিক ক্ষমতার সীমা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
গ্রেপ্তারের পটভূমি
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনামলে দলীয় পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে পরিচিত একাত্তর টেলিভিশনের উপস্থাপক ফারজানা রুপা এবং চ্যানেলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবুকে গত ১৪ মে আইসিটিতে হাজির করা হয়। বিচারকেরা তাঁদের পুনরায় হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। প্রসিকিউশন দাবি করে, তদন্ত কর্মকর্তা তাঁদের মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গুমের ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে প্রমাণ পেয়েছেন।
দুই সাংবাদিকই পৃথক হত্যা মামলায় অভিযোগ গঠনের আগেই জামিনবিহীন অবস্থায় ২১ মাসের বেশি সময় ধরে কারাবন্দী। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটানো ছাত্র আন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে সংঘটিত শত শত হত্যাকাণ্ডে তাঁদের কথিত ভূমিকার ভিত্তিতে অভিযোগগুলো করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রসিকিউশন তাঁদের বিরুদ্ধে এসব হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করতে পারেনি।
২০১৩ সালের ঘটনা
নতুন গ্রেপ্তারগুলো ২০১৩ সালের ৫ মের ঘটনাকে ঘিরে। তখন আওয়ামী লীগের প্রথম মেয়াদে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের লক্ষাধিক সমর্থক সমাবেশ করেছিলেন। তাঁরা নাস্তিক ব্লগারদের বিচার এবং নতুন ব্লাসফেমি আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছিলেন। নিরাপত্তা বাহিনী সমাবেশটি ছত্রভঙ্গ করতে অভিযান চালায়।
সেই সময় সংবাদমাধ্যম জানায়, ঢাকাসহ আশপাশে অন্তত ২১ জন গুলিতে নিহত হন, যদিও প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক ছিল। সরকার ১১ জনের মৃত্যু স্বীকার করেছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে অন্তত ৫৮ জন নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছিল, যার মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর ৮ জন সদস্যও ছিলেন। বাংলাদেশি মানবাধিকার সংগঠন অধিকার ৬১ জন নিহত হন বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার অধিকারের দুই নেতার বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। কিন্তু এসব হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সরকার কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করেনি এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়নি।
প্রসিকিউটরের বক্তব্য
আইসিটির প্রধান প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম গত ৭ মে এক সংবাদ সম্মেলনে এই আটকের পক্ষে সাফাই দেন। তিনি বলেন, 'তাঁরা বিকৃত সংবাদ প্রচার করেছেন। হত্যাকাণ্ডের তথ্য গোপন করেছেন। জনগণের মধ্যে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েছেন। এটাই কি সাংবাদিকতা?'
আমিনুল ইসলাম একাত্তর টিভিতে ২০১৪ সালে প্রচারিত এবং ফারজানা রুপা উপস্থাপিত 'সমীকরণ' নামের একটি প্রামাণ্যচিত্রের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, 'ভাষা, তথ্য ও উপাত্ত এতটাই বিকৃত করা হয়েছিল যে সেখানে বলা হয়, একজন মানুষও নিহত বা আহত হয়নি। অথচ আমরা ওই স্থানে ৩২ জন নিহত হওয়ার তথ্য পেয়েছি।' এরপর তিনি দাবি করেন, এ প্রতিবেদন থেকেই 'স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, শাপলা চত্বরে যা ঘটেছিল, তার পরিকল্পনার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন।'
আইনজীবী ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিক্রিয়া
মোজাম্মেল বাবুর পক্ষে আইনজীবী হামিদুল মিসবাহ বলেন, এ মামলা তাঁর কাছে 'অভূতপূর্ব' এবং এটি 'বৈধ সাংবাদিকতা ও ফৌজদারি দায়বদ্ধতার সীমারেখা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।' তিনি আরও বলেন, 'সাংবাদিকদের অনেক সময় বিতর্কিত ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন করতে হয়, জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয় খতিয়ে দেখতে হয় এবং এমন তথ্য উপস্থাপন করতে হয়, যা সমাজের কিছু অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকতার কাজ বিতর্কিত বা অজনপ্রিয় হতে পারে বলেই সেটিকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।'
রুপার মেয়ে মনফুল চন্দ্রাবতী (১৯) বলেন, তাঁর মা 'মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের মুখোমুখি হচ্ছেন দেখে' তাঁর 'হৃদয় ভেঙে' গেছে। তিনি আরও বলেন, 'ঘটনাগুলো ঘটার এক বছর পর তাঁর মা প্রতিবেদনটি করেছিলেন এবং একই ঘটনাগুলো নিয়ে আরও বহু সাংবাদিক প্রতিবেদন করেছেন।'
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ক্যাম্পেইন ফর প্রেস ফ্রিডমের এশিয়া-প্যাসিফিক কর্মসূচির সমন্বয়ক কুনাল মজুমদার বলেন, 'কোনো বিতর্কিত রাজনৈতিক ঘটনাকে কীভাবে কাভার করা হবে—এ নিয়ে সম্পাদনাগত সিদ্ধান্ত কখনোই মানবতাবিরোধী অপরাধ হতে পারে না। সাংবাদিকদের শাস্তি দিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের কাঠামো ব্যবহার করা হলে তা বাংলাদেশের নিজস্ব সংবিধানে সংবাদমাধ্যমের জন্য নিশ্চিত করা মৌলিক সুরক্ষাকে পাশ কাটিয়ে যায় এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ লঙ্ঘন করে।'
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক পরিচালক স্মৃতি সিংহ বলেন, 'ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল হক (বাবু), যাঁরা ইতিমধ্যে আটক রয়েছেন, এখন এক দশকের বেশি আগে প্রচারিত একটি প্রতিবেদনকে ঘিরে অস্পষ্ট নতুন অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধসংক্রান্ত মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার মৌলিক নীতির প্রতি আঘাত এবং এটি এমন এক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে, যা প্রতিশোধের ভয় ছাড়াই প্রতিবেদন করার অধিকারকে হুমকির মুখে ফেলে।'
আইসিটির অন্যান্য মামলা
আইসিটি এখন পর্যন্ত এমন কোনো দাবি করেনি যে একাত্তর টিভি, বাবু বা রুপা এমন কিছু বলেছেন বা প্রচার করেছেন, যা আন্তর্জাতিক অপরাধে 'সরাসরি ও প্রকাশ্য প্ররোচনা'র প্রমাণ হিসেবে গণ্য হতে পারে। অর্থাৎ রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালের মামলার মতো শক্ত কোনো প্রমাণ তারা এখনো দেখাতে পারেনি।
২০২৫ সালের মার্চ মাসে ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার বেনজীর আহমেদ, আরও সাতজন রাজনীতিবিদ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। অভিযুক্তদের বেশির ভাগই বর্তমানে বাংলাদেশের বাইরে অবস্থান করছেন। একই বছরের নভেম্বর মাসে আইসিটি লেখক ও কর্মী শাহরিয়ার কবিরের বিরুদ্ধেও অনুরূপ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।



