‘ডিম ভেজে রেখো, আমি একটু দোকান থেকে এসে ভাত খাবো’— স্ত্রীকে বলে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন স্কুলদপ্তরি স্বপন বড়ুয়া। হাতে ছিল একটি টর্চলাইট ও ছাতা। কিন্তু আর ঘরে ফেরা হয়নি তার। সারারাত খোঁজাখুঁজির পর বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে কর্মস্থল স্কুলের পাশের একটি বিল থেকে উদ্ধার করা হয় তার মরদেহ।
নিহতের পরিচিতি ও পরিবার
নিহত স্বপন বড়ুয়া (৫৬) রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ুয়া পাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং গৌরচন্দ্র-যতীন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী ও নৈশপ্রহরী হিসেবে দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন। স্কুলের পাশেই তার বাড়ি। তার বাবা মৃত বিমল বড়ুয়া। স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই বিবাহিত মেয়েকে নিয়ে চলছিল তার ছোট্ট সংসার।
ঘটনার বিবরণ
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার বিকেলে বাজার-সদাই করে বাড়ি ফেরেন স্বপন বড়ুয়া। সন্ধ্যা ৭টার দিকে স্ত্রীকে ডিমভাজি প্রস্তুত রাখতে বলে তিনি বাড়ি থেকে বের হন। বাইরে পা ধোঁয়ার জন্য পানিও রেখে যান। কিন্তু রাত গভীর হলেও তিনি আর ফিরে আসেননি। নিহতের বড় মেয়ে দোলা বড়ুয়া বলেন, বাবা মাকে বলেছিলেন ডিম ভেজে রাখতে, তিনি দোকান থেকে এসে ভাত খাবেন। পরে দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি সেখানে যাননি। সারারাত আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা খোঁজাখুঁজি করেছেন। সকালে খবর পাই, বাবার মরদেহ পাওয়া গেছে।
মরদেহ উদ্ধার
গৌরচন্দ্র-যতীন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অশোতোষ বড়ুয়া জানান, বুধবার সকাল পর্যন্ত স্বপনের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। বেলা ১২টার দিকে বিদ্যালয়ের পাশের বিলে ধান কুড়াতে গিয়ে স্থানীয় কৃষক কাঞ্চন বড়ুয়া মরদেহ দেখতে পান। খবর পেয়ে স্থানীয় গ্রাম পুলিশ, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং রাউজান থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য থানায় নিয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য
প্রতিবেশী প্রসেনজিৎ বড়ুয়া জানান, রাত ৩টা পর্যন্ত আমরা খোঁজ করেছি। সকালে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এর মধ্যেই খবর পাই মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। স্কুল থেকে প্রায় ৩ শত মিটার দূরে বিলের মধ্যে বিএডিসির একটি পিলারের পাশে তিনি চিৎ হয়ে পড়ে ছিলেন। তার হাতে ছাতা ছিল, পাশে টর্চলাইট ও দুটি বিষের বোতল পাওয়া গেছে।
মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারীদের কেউ কেউ মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। স্থানীয় বিহারের অধ্যক্ষ শ্মশান রক্ষিত ভিক্ষু বলেন, মরদেহের পাশে বিষের বোতল এবং মুখে ফেনা দেখা গেলেও হাতে, পিঠে ও ঘাড়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তার ভাষ্য, এটি স্বাভাবিক মৃত্যু বলে মনে হচ্ছে না। বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তিনি আরও জানান, স্বপন বড়ুয়া জনতা ব্যাংকের একটি ঋণের জামিনদার ছিলেন। ঋণগ্রহীতার ঋণ পরিশোধসংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে তিনি কিছুদিন ধরে মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন বলে জানা গেছে। তবে এর সঙ্গে মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
স্থানীয়দের সন্দেহ
স্থানীয়দের একটি অংশেরও দাবি, তাকে মারধরের পর জোরপূর্বক বিষপান করিয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটানো হয়ে থাকতে পারে। যদিও এসব দাবির সত্যতা এখনো প্রমাণিত হয়নি। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অশোতোষ বড়ুয়া জানান, ২০০০ সাল থেকে স্বপন বড়ুয়া বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। চাকরির আরও প্রায় তিন বছর বাকি ছিল। বুধবার ব্যাংকে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে আগের দিন তিনি ছুটির আবেদনও করেছিলেন। সহকর্মীদের ভাষ্য, শান্ত স্বভাবের ও দায়িত্বশীল কর্মী হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন তিনি। হঠাৎ এ ধরনের মৃত্যু তাদেরও বিস্মিত করেছে।
পুলিশের বক্তব্য
রাউজান থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি অপমৃত্যু বলে মনে হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। তদন্তের সব দিক গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
রাউজানে সাম্প্রতিক কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত ১৩ জুন উপজেলার পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে। এরপর ১৬ জুন সকালে উরকিরচর এলাকায় খালাতো বোনের বাড়ির উঠান থেকে উদ্ধার করা হয় ফটিকছড়ির নানুপুর এলাকার মানসিক ভারসাম্যহীন যুবক মো. রাশেদের (৪২) মরদেহ। ওই ঘটনায়ও পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যার অভিযোগ তোলা হলেও পুলিশ প্রাথমিকভাবে অপমৃত্যুর কথা জানিয়েছিল। পরপর কয়েক দিনের ব্যবধানে একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড এবং দুটি রহস্যজনক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় রাউজানের বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ও নানা আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, যাতে জনমনে তৈরি হওয়া শঙ্কার অবসান ঘটে।



