বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন তার বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর। তার অভিযোগ, তৎকালীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু নিজের ছেলে সুনাম দেবনাথকে আড়াল করতেই মিন্নিকে আসামি করা হয়।
সাত বছর পূর্তি
গতকাল (২৬ জুন) রিফাত শরীফ হত্যা মামলার সাত বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০১৯ সালের ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে স্ত্রী মিন্নির উপস্থিতিতেই প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রিফাতকে। ওই মামলায় পরবর্তীতে মিন্নিসহ কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। বর্তমানে তিনি বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে রয়েছেন।
কারাগারে মিন্নির অবস্থা
কারা সূত্রে জানা গেছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি হিসেবে মিন্নি অধিকাংশ সময় নিরিবিলি থাকেন। নিয়মিত নামাজ ও ধর্মীয় অনুশীলনের মধ্য দিয়েই তার দিন কাটে। কারাগারের অন্য বন্দি বা কারারক্ষীদের সঙ্গে খুব একটা কথা বলেন না। কেবল বাবা-মা বা স্বজনরা সাক্ষাৎ করতে এলে তাদের সঙ্গে কিছু সময় কথা বলেন। কারা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, কারাগারে তার আচরণ স্বাভাবিক এবং এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ ওঠেনি।
মিন্নিকে প্রথমে কাশিমপুর কারাগারে রাখা হলেও পরে মামলার কার্যক্রম পরিচালনা এবং স্বজনদের সাক্ষাতের সুবিধার কথা বিবেচনা করে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনা
আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজসংলগ্ন এলাকায় রিফাত শরীফের ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় একদল যুবক। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়।
মামলার অগ্রগতি
হত্যাকাণ্ডের পরদিন রিফাতের বাবা আব্দুল হালিম দুলাল শরীফ বরগুনা সদর থানায় হত্যা মামলা করেন। এতে ১২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশের দাবি ছিল, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় রিফাতের স্ত্রী মিন্নির সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। এরপর ঘটনার প্রায় ২০ দিন পর তাকে গ্রেফতার করা হয়।
তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। এতে মোট ২৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। প্রাপ্তবয়স্ক ও অপ্রাপ্তবয়স্ক— দুই ভাগে মামলার বিচার চলে। ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের মামলায় আদালত মিন্নিসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন এবং চারজনকে খালাস দেন। একই বছরের ২৭ অক্টোবর শিশু আদালত অপ্রাপ্তবয়স্ক কয়েকজন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন।
মিন্নির পরিবারের অভিযোগ
মামলার শুরু থেকেই মিন্নির পরিবার দাবি করে আসছে, তাকে পরিকল্পিতভাবে এ মামলায় জড়ানো হয়েছে। তাদের অভিযোগ, তদন্তের সময় প্রকৃত ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নেওয়া হয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে একজন সাক্ষীকে আসামিতে পরিণত করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়, গুরুত্বপূর্ণ আলামত ও সিসিটিভি ফুটেজ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি এবং তদন্তে নানা অসঙ্গতি ছিল।
মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর গণমাধ্যমের কাছে বরাবরই একই অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, "মিন্নি তার স্বামীকে হাজারো মানুষের সামনে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। কিন্তু সে ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত সে খুনি হয়ে গেল শুধু শম্ভুদার কারণে। তিনি এমন একটি পরিকল্পনা এখানে করেন তার ছেলেকে বাঁচানোর জন্য। তার ছেলে হলো বরগুনার মাদক সম্রাট। সে মাদকের ডিলার এবং এই ‘নয়ন বন্ড’ থেকে শুরু করে বরগুনার যত মাদকাসক্ত মানুষ ও যুব সমাজ সবই তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।"
বন্ড বাহিনী ও সুনাম দেবনাথ
কিশোর গ্যাং ‘বন্ড বাহিনী’ আওয়ামী লীগের এমপি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে সুনাম দেবনাথের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠে। বন্ড বাহিনীর মাদকের ব্যবসা চালাত সুনাম। তাকে বাঁচাতেই শম্ভু নির্দোষ মিন্নিকে ফাঁসিয়েছেন বলে অভিযোগ মোজাম্মেল হোসেন কিশোরের।



