রাম মন্দিরের দান তছরুপ: কংগ্রেসের হোর্ডিং, বড় রাজনৈতিক বিতর্ক
রাম মন্দিরের দান তছরুপ: কংগ্রেসের হোর্ডিং, বিতর্ক

উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় রাম মন্দিরের দান করা অর্থ তছরুপের অভিযোগ তুলে কংগ্রেস নেতার লাগানো একটি বিশাল হোর্ডিং। এতে দুর্নীতির প্রতিবাদ ও ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে নির্মিত অযোধ্যার রাম মন্দিরে হিন্দু ভক্তদের দেওয়া অর্থ তছরুপের অভিযোগ ঘিরে ভারতে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়েছে। এই রাম মন্দির বিজেপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রকল্প। তবে কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টিসহ বিরোধী দলগুলো মন্দিরের ট্রাস্টের কার্যক্রম নিয়ে সরাসরি তোপ দেগেছে। বিষয়টি এখন আর শুধু দানবাক্স চুরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং বড় ধরনের রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নিয়েছে।

এসআইটি গঠন ও বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া

কট্টর হিন্দুত্ববাদী যোগী আদিত্যনাথের উত্তরপ্রদেশ রাজ্য সরকার জালিয়াতির অভিযোগ তদন্তে বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) গঠন করার পর এর কড়া সমালোচনা করেছেন সমাজবাদী পার্টির (এসপি) প্রধান অখিলেশ যাদব। সোমবার এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘এটি দুর্ভাগ্যজনক যে উত্তরপ্রদেশে বিজেপির শাসন দুর্নীতিগ্রস্ত। তা না হলে এখানে এসআইটির বদলে আইআইটি (ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি) গড়ে উঠত।’ সমাজবাদী পার্টিই প্রথম রাম মন্দিরে আসা জনসাধারণের দানের টাকা তছরুপের বিষয়টি সামনে আনে। অপরাধীরা খুব দূরে নেই—এমন মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সরকারকে রীতিমতো বেকায়দায় ফেলেছেন অখিলেশ যাদব। অভিযোগ তদন্তে পুলিশকে ‘সহায়তা’ করার কথা জানিয়ে তিনি মূলত সরকারকে বড় ধরনের চাপের মুখে রেখেছেন।

ট্রাস্টের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন

বছরের পর বছর ধরে বিজেপি দাবি করে আসছে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে একটি স্বাধীন ট্রাস্ট রাম মন্দির গঠন করেছে। কিন্তু এখন সেই ট্রাস্টের সদস্যদের সততা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। বলা হচ্ছে, এই সদস্যরা সরকারের পছন্দের লোক। ট্রাস্ট কর্তৃপক্ষ এখন সাফাই দিচ্ছে, তারা মন্দিরের দৈনন্দিন কাজ তদারকি করে না। তবে এমন ব্যাখ্যা আর কোনো কাজে আসছে না। উল্টো বিরোধী দলগুলো এখন সরাসরি বিজেপি ও কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের হিন্দুত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দিকেই আঙুল তুলছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি

‘দৈনিক ভাস্কর’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে কংগ্রেস দল এক্সে লিখেছে, মন্দিরের ট্রাস্টের অব্যবস্থাপনায় প্রায় ২০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। কংগ্রেস একে ‘আস্থার ডাকাতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। দলটির পোস্টে বলা হয়, ‘এটি স্পষ্টত মানুষের বিশ্বাস ডাকাতি করার শামিল। কোটি কোটি হিন্দু ভক্তের আবেগ রাম মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এই দানের অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে বিজেপি ও আরএসএসের লোকেরা সাধারণ মানুষের বিশ্বাসে আঘাত করেছে।’

নতুন ট্রাস্ট গঠনের দাবি

রাম মন্দির ট্রাস্টের সব সদস্য, বিশেষ করে ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই ও অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। আম আদমি পার্টির (আপ) সংসদ সদস্য সঞ্জয় সিং বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ভারত সরকারই এই ট্রাস্ট গঠন করেছিল। যেহেতু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বিষয়টি তদারকি করে, তাই নরেন্দ্র মোদি এর দায় এড়াতে পারেন না। সঞ্জয় সিং অভিযোগ করেছেন, মন্দিরের ৫০ জনের বেশি কর্মচারী দান করা অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত। ট্রাস্টের মাধ্যমে আগে জমি কেনাবেচা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। এসব ঘটনার তদন্ত চেয়ে তিনি বর্তমান ট্রাস্ট ভেঙে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এখন ‘সৎ ও নিরপেক্ষ সদস্যদের’ নিয়ে নতুন ট্রাস্ট গঠন করা প্রয়োজন।

ট্রাস্ট গঠনে মোদির ভূমিকা

প্রশ্ন হলো, এই ট্রাস্ট আসলে কতটা স্বাধীন ছিল? ২০২০ সালে অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণের জন্য একটি ‘স্বাধীন ট্রাস্ট’ গঠনের কথা বলা হয়েছিল। তবে সরকারের পক্ষ থেকে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই প্রক্রিয়ায় মোদির ভূমিকার কথা ফলাও করে প্রচার করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে দেওয়া ৪০৪ শব্দের ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ‘প্রধানমন্ত্রী’ শব্দটি ৪ বার এবং ‘পিএম’ শব্দটি ৯ বার ব্যবহার করা হয়েছিল। ট্রাস্টের নিজস্ব ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এর ১৫ জন সদস্যের মধ্যে ১২ জনকেই মনোনীত করা হয়েছিল লোকসভায় মোদি ট্রাস্ট গঠনের ঘোষণা দেওয়ার পর। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজেই এই ট্রাস্টের সদস্যদের নাম ও কাঠামো ঘোষণা করেছিলেন।

বিজেপির জন্য বড় বিপদ

এই জালিয়াতির অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়া এখন প্রায় অসম্ভব। কারণ, বিজেপি কয়েক দশক ধরে এই রাম মন্দির প্রকল্প থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লুটেছে। তারা বাবরি মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণকে হিন্দুত্ববাদীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন হিসেবেও প্রচার করে আসছে। দৈনিক ভাস্করের পলিটিক্যাল এডিটর কে পি মালিক এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘অযোধ্যার রাম মন্দিরের দানে প্রায় ২০০ কোটি টাকার কেলেঙ্কারির খবরটি অত্যন্ত গুরুতর ও উদ্বেগজনক। যদি সত্যিই এত বড় অনিয়ম হয়ে থাকে, তবে প্রশ্ন জাগে—এর দায় কে নেবে?’ কে পি মালিক এই জালিয়াতির অভিযোগকে হিন্দু বিশ্বাসের ওপর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করে এর জবাবদিহি চেয়েছেন।

তৃণমূল পর্যায়ে আন্দোলন

সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন একটি বিষয় নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দল যেকোনো মূল্যে একধরনের উগ্র হিন্দুত্ববাদী পরিচয় প্রচার করতে চেয়েছিলেন। সেই পরিচয়ের প্রধান প্রতীক হলো কথিত রাম মন্দির। এখন সেই মন্দিরেই আর্থিক অনিয়মের ছায়া পড়েছে। এটি বিজেপি ও সরকারের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। যে আদর্শকে তাঁরা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, তার স্বচ্ছতা নিয়েই এখন জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

রাম মন্দিরের অর্থ তছরুপের প্রতিবাদে অযোধ্যায় এখন তৃণমূল পর্যায়ে আন্দোলন শুরু হয়েছে। গত সোমবার কংগ্রেস নেতা শারদ শুক্লা অযোধ্যা শহরে বিশাল এক হোর্ডিং টানিয়ে দেন। সেখানে রাম মন্দিরের দানবাক্সের টাকা চুরির দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী এই চুরির জন্য কী শাস্তি হওয়া উচিত, তা-ও উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজেপির দুর্নীতিবিরোধী ভাবমূর্তি ধুলিস্যাৎ

উত্তরপ্রদেশে বিজেপি মূলত দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের ডাক দিয়ে এবং প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তিকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। অথচ এখন সেই রাজ্যেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লাগানো পোস্টার সরিয়ে ফেলতে দেখা গেছে পৌরসভার কর্মীদের। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, পোস্টারটি ছিঁড়ে ফেলার পর তার নিচ থেকে অন্য একটি বাণিজ্যিক পণ্যের বিজ্ঞাপন বেরিয়ে পড়ে।

বিনয় কাটিয়ারের ক্ষোভ

হিন্দুত্ববাদের পুরোনো কণ্ঠস্বরগুলো এখন আবার সরব হতে শুরু করেছে। দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসার পর থেকে হিন্দুত্ববাদের পুরোনো পুরোধা ব্যক্তিরা বর্তমান মন্দির কমিটির বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। তাঁদেরই একজন হলেন বিজেপি নেতা বিনয় কাটিয়ার। উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি এবং ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনায় তিনি একসময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত এক চরিত্রে ছিলেন। অর্থ তছরুপের অভিযোগ নিয়ে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করলে বিনয় কাটিয়ার সরাসরি বলেন, ‘ইয়ে জিতনে হ্যায়, সব চোর হ্যায়’ (এখানে যারা আছে, সবাই চোর)। মন্দির প্রকল্পের দায়িত্ব হারানোর পর বর্তমানে যাঁরা এর সঙ্গে জড়িত, তাদের সবাইকে তিনি ‘চোর’ হিসেবে অভিহিত করেন।

বিনয় কাটিয়ারের পটভূমি

বিনয় কাটিয়ার বিজেপির সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এবং উত্তরপ্রদেশ বিজেপির সাবেক সভাপতি ছিলেন। তিনি লোকসভা ও রাজ্যসভার সাবেক সদস্যও ছিলেন। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময় তিনি আন্দোলনে সামনে থেকে উগ্রতা ও হিন্দত্ববাদ ছড়িয়েছিলেন। সেই ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি মামলা করা হলেও দীর্ঘ সময়ে তার কোনো সুরাহা হয়নি। ১৯৮৪ সালে বিনয় কাটিয়ার উগ্র হিন্দুত্ববাদী বজরং দল প্রতিষ্ঠা করেন, যাদের মূর কাজই হচ্ছে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সংগঠনটি যে উগ্র রূপ ধারণ করেছে, তাতে কাটিয়ারের তেমন ভূমিকা ছিল না। রাম মন্দির নির্মাণের কাজেও তাঁকে সেভাবে রাখা হয়নি। এমনকি মোদির নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত মন্দিরের তথাকথিত প্রাণপ্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানেও তাঁকে দেখা যায়নি। বিনয় কাটিয়াকে এভাবে কোণঠাসা করে রাখায় তিনি যে চরম ক্ষুব্ধ ও তিক্ত, তা প্রকাশ করতে তিনি কখনোই দ্বিধা করেননি।

আগামী নির্বাচনে প্রভাব

মোদি যুগের এই ‘চকচকে’ হিন্দুত্ববাদ নিয়ে বিনয় কাটিয়ারের মনে অনেক ক্ষোভ। তিনি দলকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন, তাঁর মতো নেতাদের আত্মত্যাগের ওপর ভিত্তি করেই বর্তমান নেতৃত্ব আজ সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে অযোধ্যা আসনে বিজেপির পরাজয়ের পর কাটিয়ার আবারও রাজনীতিতে নিজের গুরুত্ব জাহির করছেন। দল তাঁকে কোণঠাসা করলেও তিনি ‘অবসর’ নেননি। বরং আওয়াধ অঞ্চলে তিনি নিয়মিত হিন্দুত্ববাদী আবেগ উসকে দেওয়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০২৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিনয় কাটিয়ারের এই আক্রমণাত্মক অবস্থান বিজেপির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

আগামী নির্বাচনে উগ্র হিন্দুত্ববাদী ও মুসলিম বিদ্বেষী বিতর্কিত মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের নেতৃত্বে টানা তৃতীয় জয়ের লক্ষ্যে মাঠে নামবে বিজেপি। তবে গত লোকসভা নির্বাচনে সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেস জোটের কাছে বড় ধাক্কা খেয়েছে গেরুয়া শিবির। ২০০৪ সালে বিজেপি তাদের উত্তরপ্রদেশ শাখার তৎকালীন সভাপতি বিনয় কাটিয়ারকে সরিয়ে দিয়েছিল। তখন কংগ্রেস তাদের দলে অনগ্রসর শ্রেণির নতুন মুখ এনে সামাজিক ভিত্তি মজবুত করছিল। অন্যদিকে উচ্চবর্ণের ভোটারদের ধরে রাখতে বিজেপি অনগ্রসর শ্রেণির নেতা কাটিয়ারকে পদ থেকে সরিয়ে দেয়। সে সময় বিজেপি অনগ্রসর শ্রেণির ভোট পাওয়ার আশা একপ্রকার ছেড়ে দিয়েছিল। ২০২৭ সালেও দলটিকে অখিলেশ যাদবের ‘পিডিএ’ (অনগ্রসর-দলিত-আদিবাসী) সমীকরণের মোকাবিলা করতে হবে। অখিলেশের এই জোটের সঙ্গে কংগ্রেস ও অন্য সহযোগীরাও থাকতে পারে। এই সামাজিক জোটটি গত নির্বাচনে অযোধ্যায় বিজেপির পরাজয়ের প্রধান কারণ ছিল।