পুলিশ সংস্কার জরুরি, নাহলে পুনরাবৃত্তি হবে নিপীড়ন
পুলিশ সংস্কার জরুরি, নাহলে পুনরাবৃত্তি হবে নিপীড়ন

ঠিক ১০ বছর আগে, ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথম আলোতে একটি শিরোনাম দেখা গিয়েছিল—‘মাছের রাজা ইলিশ আর দেশের রাজা পুলিশ’। রাজধানীর মীর হাজীরবাগ এলাকায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা বিকাশ চন্দ্র দাসকে মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে পেটানোর সময় পুলিশ এই কথা বলেছিল বলে জানিয়েছিলেন একজন প্রত্যক্ষদর্শী নারী পরিচ্ছন্নতাকর্মী। আহত বিকাশ চন্দ্র দাসকে আইসিইউতে যেতে হয়েছিল।

পুলিশের রাজকীয় ভূমিকা ও দুর্নীতি

আওয়ামী লীগের আমলে অজস্র পুলিশি নির্যাতন ও নিপীড়নের মধ্যে এটি তেমন উল্লেখযোগ্য নয়, কিন্তু ওই উক্তিটির কারণেই সংবাদটির কথা বারবার মনে আসে। ক্রসফায়ার, গুম ও নিপীড়নের ঘটনার মতো ব্যাপক দুর্নীতির সঙ্গেও পুলিশের নাম জড়িয়েছে। গত সরকারের আমলেই প্রথম আলোর আরেকটি সংবাদের শিরোনাম ছিল সাবেক পুলিশপ্রধানকে নিয়ে: ‘বেনজীর পরিবারের ৩৪৫ বিঘা জমি, সবচেয়ে বেশি স্ত্রীর নামে’। এত বিপুল অর্থ তারা বিদেশে পাচার করেছেন, যা খুব কম সফল ব্যবসায়ীই করতে পারেন।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রে কিছু একটা ঘটেছে, যা পুলিশকে দেশের রাজা বানিয়েছে, বাকিদের বানিয়েছে প্রজা। যেকোনো ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন–সংগ্রাম দমনে পুলিশ ছিল সরকারের প্রধান ঢাল। ২০১৪ সালের নির্বাচন সরকার সম্পন্ন করতে পেরেছিল প্রধানত পুলিশের ওপর ভর করেই। ঐতিহাসিকভাবেই পুলিশের সঙ্গে বাংলাদেশে জনগণের সম্পর্কটা স্বাভাবিক ছিল না কখনোই, কিন্তু রাজা হওয়ার অনুভূতিটা পুলিশের মধ্যে ২০১৪ সাল থেকেই প্রবল হতে শুরু করে। ২০১৮ সালের রাতের ভোটেও পুলিশই ছিল প্রধান অস্ত্র।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গণ-অভ্যুত্থানের পরও পরিবর্তনের অভাব

এর মধ্যে একটি আস্ত গণ–অভ্যুত্থান ঘটে গেছে। কিন্তু লক্ষণ বদলেছে কতখানি? গত কয়েক দিনের শিরোনামগুলো খেয়াল করুন। একজন জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে অটোরিকশা থেকে নামিয়ে পিটিয়েছে পুলিশ। পুলিশ হেফাজতে একজন যুবলীগ কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। তুরাগ নদের পানিতে ডুবে ছাত্রলীগ পরিচয় আছে এমন একাধিক তরুণের মৃত্যু হয়েছে। এখন পর্যন্ত রাস্তায় নানা দাবিদাওয়ার আন্দোলন–সংগ্রাম তত প্রবল নয়, তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও বিক্ষোভকারীদের ওপর এবং বিশেষ করে নারীদের ওপর পুলিশের নৃশংসভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার কয়েকটি দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে।

আরও একটি শিরোনাম ছিল—‘মামলা নিয়ে বহুস্তরের বাণিজ্য, জড়িত রাজনীতিক, পুলিশ’। গণ–অভ্যুত্থানের পর মামলা–বাণিজ্য করে লীগের নেতাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা গোটা দেশেই আলোচনায় আছে। এখানেও পুলিশের বদল নেই। লীগ আমলেও প্রতিটি নির্বাচনের আগে কিংবা আন্দোলন কর্মসূচির আগে-পরে বিপুল মামলা–বাণিজ্য চলত।

পুলিশ সংস্কারের তিনটি স্তর

পুলিশ সংস্কার শুধু নাগরিকদের দাবি নয়, বরং পুলিশের নিম্নপদস্থ অংশগুলোরও দাবি। ৫ আগস্টের পরপর রাজারবাগে পুলিশের নিম্নপদস্থ অংশগুলো সংঘবদ্ধভাবে এমন কতগুলো দাবি তুলেছিল, যা আদতে জনগণেরই দাবি! অর্থাৎ পুলিশের মাঝেও আলাদা ‘রাজা’বর্গ রয়েছেন, বাকিরা লাঠিয়াল। জনগণের মুখোমুখি এক মাসের যুদ্ধের পর, বহু প্রাণ নেওয়া ও কিছু প্রাণ দেওয়ার পর তারা আবিষ্কার করলেন: সব পুলিশ সমানভাবে বিপদগ্রস্ত নন, সব পুলিশের জীবন সমান নয়, এক বর্গের পুলিশই কেবল প্রাণ দেন, আঘাত সহ্য করেন এবং যেকোনো বাছবিচারহীন হুকুম তামিল করতে বাধ্য হন। পুলিশের সেই ১১ দফার প্রথম দফাটাই ছিল: রাজনৈতিকভাবে যাতে পুলিশকে ব্যবহার করা না যায়, এ কারণে কমিশন গঠন করতে হবে।

নাগরিকদের দিক থেকে পুলিশের সংস্কার বলতে আসলে কী বোঝায়? পুলিশ বাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য মোটাদাগে তিন ধরনের সংস্কার প্রয়োজন: ক) কাঠামোগত সংস্কার: পুলিশ কাঠামোগতভাবে ঔপনিবেশিক আমলের রয়েছে। তিন স্তরে বিভক্ত এবং প্রবল বৈষম্যমূলক এই কাঠামোর সংস্কার করে মান যাচাইয়ের ভিত্তিতে পেশাগত উন্নতির সুযোগ সবার জন্য যৌক্তিক ও ন্যায্য করা প্রয়োজন। খ) প্রশিক্ষণগত সংস্কার: পুলিশের সদস্যদের উপযুক্ত শিক্ষা, আচরণগত ও মনস্তাত্ত্বিকসহ সব ধরনের পেশাগত প্রশিক্ষণ ও মান উন্নয়ন প্রভৃতি দিকে যথাযথ নজর দেওয়া দরকার। গ) কর্মস্থলের সংস্কার: পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাধারণ পুলিশ সদস্যদের ভৃত্যসুলভ সম্পর্কে পরিবর্তন আনা জরুরি। পুলিশের ছুটি, ওভারটাইম, পেশাগত ঝুঁকি ইত্যাদি ক্ষেত্রে যৌক্তিক সংস্কার জরুরি। এর সঙ্গে প্রয়োজন কর্মস্থলে পুলিশ সদস্যরা যে দাবিটি ৫ আগস্টের পর তুলেছিলেন, ঊর্ধ্বতন ব্যক্তি বেআইনি আদেশ দিলে তা মানতে বাধ্য না হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা।

স্বাধীন তদারকি সংস্থার প্রয়োজনীয়তা

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর মতো ঘটনাতেও সর্বোচ্চ শাস্তি কেবল বদলিটুকুই হয়ে থাকে। এর বাইরেও অজস্র নিপীড়ন, চাঁদাবাজি, হয়রানি, দায়িত্বহীনতা, কর্তব্যে অবহেলা, দুর্নীতি, ভীতি প্রদর্শন ইত্যাদি ঘটনা ঘটে, যার বড় অংশের ক্ষেত্রেই বিষয়টি অভিযোগের স্তর পর্যন্তই যায় না। এর কারণ হলো, এই সবগুলো অপরাধ পুলিশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত প্রক্রিয়ার কারণে হয়। পুলিশের বহু সদস্য এর অংশীদার, বাকিরা হয়তো নীরব থাকেন। পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় এই অপরাধগুলো কখনোই উদঘাটিত হবে না, কিংবা হলেও প্রকাশ্যে আসবে না। এমনকি এই ধরনের বহু অপরাধকে আদতে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিতেই তারা হয়তো রাজি হবেন না। যেমন দেশের পরিবহনব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা প্রত্যেক মানুষ জানেন, ঢাকার পরিবহন জগতের বিশৃঙ্খলা স্থায়ী হওয়ার একটি বড় কারণ হলো পুলিশের বহু সদস্যের জন্য এই বিশৃঙ্খলাই লাভজনক।

পুলিশ যদি নিজে কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, পুলিশ যদি নাগরিকদের সঙ্গে অপেশাদার আচরণ করে, পুলিশ যদি নিপীড়ন বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, নাগরিকেরা কার কাছে নালিশ করবে? সেই পুলিশের কাছেই? তারা নিজেরাই নিজেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করবে? বেনজীরের মতো ঘটনায় অভ্যন্তরীণ রেষারেষির কারণে, কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার নিজেদের ক্ষমতার বিবাদে বেনজীর অবসর নেওয়ার পর তাঁর সম্পদ নিয়ে প্রচুর তথ্য প্রকাশিত হয়। কিন্তু বেনজীর যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তাঁর ঘড়ির দাম নিয়ে নেত্র নিউজ বিদেশ থেকে সংবাদ প্রচার করেছিল। দেশের ভেতরকার গণমাধ্যমগুলোর জন্য সেই সংবাদ প্রকাশ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তাহলে কি পুলিশের কর্তাদের বিবাদ ছাড়া সেখানকার দুর্নীতির সংবাদ আমরা আদৌ পাব না কখনো?

এ কারণেই প্রয়োজন পৃথক ও স্বাধীন তদারকি সংস্থা গড়ে তোলা, যারা পুলিশের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগগুলো নিয়ে তদন্ত করবে। এই সংস্থার সদস্যরা তাদের বেতন, বদলি, পদোন্নতি, নিয়োগ প্রভৃতির জন্য পুলিশের ওপর নির্ভরশীল থাকবেন না। তারা পুলিশের অনিয়ম ও আইন ভঙ্গের অভিযোগগুলো নিয়ে কাজ করবেন। মাঠে তদন্ত করার সময়ে তদন্তকারী হিসেবে তারা পূর্ণ অধিকার ভোগ করবেন। তাদের কার্যালয় পৃথক হবে। তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা পুলিশ বিভাগের অধীন হবেন না। আদর্শ উদাহরণগুলোতে, এই তদারকি সংস্থার পরিচালনা পর্ষদে বিভিন্ন স্তরের নাগরিক প্রতিনিধিও থাকবেন।

এর জন্য অনেক পৃথক দৃষ্টান্ত ও কাঠামো নানা দেশে রয়েছে। নিউজিল্যান্ডে আছে ইনডিপেনডেন্ট পুলিশ কন্ডাক্ট অথরিটি অব নিউজিল্যান্ড (আইপিসিএ)। কানাডার অন্টারিওতে আছে দ্য স্পেশাল ইনভেস্টিগেশনস ইউনিট (এসআইইউ)। উত্তর আয়ারল্যান্ডে আছে দ্য অফিস অব দ্য পুলিশ ওমবুডসম্যান ফর নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড (ওপিওএনআই)। জাপানেও এমন সংস্থা রয়েছে যার কর্তৃত্বে রয়েছেন নাগরিকেরা, যদিও সেখানে তদন্ত পরিচালনার কাজে পুলিশের সদস্যরাই যুক্ত। বাস্তবতা ও প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী এই সংস্থাগুলোর কাজের ধরনে পার্থক্য রয়েছে, কিন্তু গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণে এই সংস্কার অবিকল্প।

মনে রাখা দরকার, মৌলিক যে প্রশ্নগুলো জনগণকে হাসিনা সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল, সেই জায়গাগুলোতে সংস্কার না করা হলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তির জন্যই অপেক্ষা করতে হবে।