পুলিশকে মানবিক হতে হবে: প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান ও বাজেট বরাদ্দের প্রেক্ষাপট
পুলিশকে মানবিক হতে হবে: প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান ও বাজেট

সাধ্য-সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে কাজ করে প্রত্যাশা পূরণের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পুলিশকে নতুন শপথে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাজেট মৌসুমে পুলিশের প্রতি এই আহ্বান বিশেষ তাৎপর্যবহ। আহ্বান ও বাস্তবতার সন্ধিক্ষণেই ঘোষণা হলো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট। এতে পুলিশের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ১৮ হাজার ৪৮ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১৭ হাজার ৭১১ কোটি টাকা। এই টাকা পুলিশকে খাওয়া-পরা বা পকেটে নেওয়ার জন্য দেওয়া হয়নি; মূল উদ্দেশ্য পরিচালন ব্যয় ও সক্ষমতা বাড়ানো, সেইসঙ্গে জননিরাপত্তা ও পুলিশের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

পুলিশের সক্ষমতার দ্বৈত চিত্র

পুলিশের সক্ষমতায় ঘাটতি নেই। বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতায় যথেষ্ট বলীয়ান। এই সক্ষমতার হিসাব দুই দিকেই দেখা যায়। উদাহরণ ভুরি ভুরি। চট্টগ্রামের লালখান বাজার এলাকায় জাতীয় ক্রিকেট দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে অটোরিকশা থেকে নামিয়ে মারধর ও থানায় নিয়ে হেনস্তার হিম্মত দেখানোও একটি সক্ষমতা। অন্যদিকে, শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ-হত্যার মাত্র সাত ঘণ্টার মধ্যে প্রধান আসামিসহ দুই জনকে গ্রেফতার করাও আরেক সক্ষমতা। শিশু রামিসা হত্যার আসামি পাকড়াওই নয়, মামলার দ্রুত তদন্ত, চার্জশিট ও বিচার প্রক্রিয়ায় ঢাকায় পুলিশের সক্ষমতার নজিরের মাইলফলকের মধ্যেই চট্টগ্রামের ঘটনা ঘটে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চট্টগ্রামের ঘটনা

ঢাকায় প্রিমিয়ার লিগের খেলা শেষ করে রাত ১০টার কিছু পর চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে অটোরিকশা করে বাসার উদ্দেশে রওনা দেন নাঈম হাসান। অটোরিকশাটি এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নামার পর লালখান বাজার এলাকায় পুলিশের এক সদস্য থামার সিগন্যাল দেন। রিকশা থামাতেই কয়েক জন ডিবি পুলিশ পরিচয়ে চালকের কাছ থেকে কাগজপত্র নিয়ে নেন। এরপর তাকে নামিয়ে গলায় ধাক্কা দিয়ে পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। তখন তিনি নিজেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় দেন এবং পরিচয়পত্রও দেখান। তবুও তাকে ঘটনাস্থলে থাকা থানার এসআই পেটাতে থাকেন, সঙ্গে সাদা পোশাকে থাকা ব্যক্তিও পেটান। মারধরের একপর্যায়ে আরেকটি অটোরিকশায় তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। পুলিশের গাড়ি থাকলেও সেখানে তাকে তোলা হয়নি। একপর্যায়ে তাকে থানায় নিয়ে যান কর্মরত এসআই। ওসির রুমেও তাকে অপদস্থ করা হয় বলে নাঈম জানান। থানায় নেওয়ার পর ফোন পেয়ে তিনি বিসিবির সভাপতি তামিম ইকবালকে ফোন করেন এবং অর্থমন্ত্রী আমির খসরুর ছেলে বিসিবির প্রভাবশালী সদস্য ইসরাফিল খসরুকেও ঘটনা জানান। তার প্রতিক্রিয়া: 'আজকে আমার সঙ্গে হয়েছে। আমার জন্য অনেক লোক এসেছে থানায়। কিন্তু অন্য সাধারণ লোকের জন্য কেউ থানায় আসবে না।' এ ঘটনায় পুলিশের ঐ এসআইসহ তিন জনকে খুলশী থানা থেকে ক্লোজড করে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, ল্যাঠা মিটে গেছে?

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পুলিশের মানসিকতা ও রাজনৈতিক প্রভাব

পুলিশের হিম্মত বা হেডমের এই দুটি ঘটনা গোটা বাহিনীটিতে গেঁথে বসা বৈশিষ্ট্য। প্রশ্ন উঠছে, পুলিশ কি পুলিশই? তারা কি মানুষ হতে চায় না? নাকি তাদেরকে মানুষ হতে দিলে, পেশাদার হতে দিলে কারো সমস্যা হয়? প্রধানমন্ত্রীর আকাঙ্ক্ষা, এই বাংলাদেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদ-স্বৈরাচার যেন পুলিশ সদস্যদের দেশ ও জনগণের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে না পারে। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় ও গণতন্ত্রকামী মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হচ্ছে জনগণের রায়ে গঠিত বর্তমান সরকার। আর এই সরকারের প্রধান তারেক রহমান। দ্রুত সময়ে ঢাকায় রামিসার হত্যাকারী ধরা পুলিশের প্রতি তার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। আর চট্টগ্রামের ঘটনা কার আকাঙ্ক্ষা? এই প্রশ্নের দ্রুত ফয়সালা দরকার।

সেনাবাহিনীর ভূমিকা ও পুলিশের ভবিষ্যৎ

ঘোষণামতো সামনে যে কোনো সময় সেনা সদস্যরা মাঠ থেকে চলে যাবে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে তারা পুলিশিংসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সর্বসাধ্য চেষ্টা করেছে। সামনের দিনগুলোতে পুলিশকে হয় মানবিক পুলিশ হতে হবে, নইলে দানবই থাকতে হবে। এর মাঝামাঝি নয়। পুলিশকে নিয়ে অনেক বদনাম, নিন্দা-সমালোচনা আছে। শিগগিরই তা কেটে যাবে—এমন আলামত নেই। বরং পদ-পদায়ন, বদলি ইত্যাদিতে ফ্যাসিবাদের ছাপ আরো বৃদ্ধির তথ্য মিলছে। অর্থ লেনদেন এবং আঞ্চলিকতার তথ্য গা শিউরে দিচ্ছে। এত মন্দ বলে পুলিশকে কাজ থেকে সরিয়ে রাখা বা কাজের সক্ষমতা প্রমাণের বাইরে রেখে দেওয়া যায় না। তাদের কাজ সেনা বা অন্য কোনো বাহিনী করে দিতেই থাকবে, তা প্রত্যাশিত নয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষায় একটি অন্যতম প্রধান ভরসার প্রতীক। 'সমরে আমরা শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা দেশের তরে'—এই মূলমন্ত্র নিয়ে তারা দেশের জাতীয় যে কোনো সংকটে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতেও প্রস্তুত থাকে। দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বা সংকটকালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরিস্থিতির অনিবার্যতায় সেনাবাহিনী দীর্ঘ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে মাঠে থাকার পর এখন ব্যারাকে ফেরার পালা।

পুলিশের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা

কোন বাস্তবতায় ২০২৪ সালে ব্যারাকের বাইরে এসে সেনাবাহিনীকে মাঠে কাজ করতে হয়েছে, তা সবারই জানা। ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুতরা কেবল নিজেরা বিতাড়িত হয়নি, পুলিশকে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে ছাত্র-জনতার ঘৃণার তালিকায়। জনসাধারণের, এমনকি পুলিশের নিজ নিজ পরিবারের কাছেও পুলিশ হয়ে গেছে ধিকৃত। সিভিল সোসাইটিতে মানুষ প্রথম চাহনিতেই দেখে পুলিশকে। তাদের চোখে ভাসে বেনজীর, শহিদুল, আসাদ, হাবিব, মনিরুল, হারুণ, বিপ্লব, প্রলয়, কৃষ্ণ, মেহেদিরা। তার মানে কি পুলিশের মধ্যে পেশাদার, নিষ্ঠাবান ও দায়িত্বশীল কেউ নেই? কিন্তু দলবাজ, দুর্নীতিবাজ, অসৎদের ভিড়ে তারা কোণঠাসা। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে পুলিশের যে ভূমিকা ছিল, তা দেখে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কোনো ছাত্র বা অভিভাবকের পক্ষে পুলিশকে শ্রদ্ধা করা কঠিন। তাদের কাছে পুলিশ পুলিশই। এই ক্রোধের সবচেয়ে ভয়ংকর বহিঃপ্রকাশ ঘটে হাসিনার পদত্যাগের পর পরই, যখন জনতা সারা দেশে পুলিশ স্টেশনে হামলা চালায়, জ্বালিয়ে দেয় এবং অফিসারদের সঙ্গে সহিংস সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।

পুলিশের দাবি ও বাস্তবতা

শেখ হাসিনার পতনের পর পুলিশ কিছু দাবি ঘোষণা করে কর্মবিরতিতে গিয়েছিল। তারা নিজেরাই নিজেদের ঘৃণিত কর্মকাণ্ড নিয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির কারণে সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম করতে রাজি নয়। স্পষ্ট জানিয়েছিল, তারা রাষ্ট্রের পুলিশ হতে চায়। সেই চাওয়াকে এখন বাস্তব করতে বাধা কোথায়? মোটকথা, পুলিশকে ফেরেশতা নয়, মানুষের কাতারভুক্ত হতে হবে। কিন্তু মানুষ হওয়ার চেয়ে পুলিশের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের হওয়ার প্রবণতা মারাত্মক পর্যায়ে। আওয়ামী পুলিশ থেকে বিএনপির পুলিশ হতে গিয়ে বাহিনীটির কারো কারো মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা। টপ টু বটম—যে যেদিক দিয়ে সম্ভব, এই অভিযাত্রায় কোমর বেঁধে নেমেছেন। বহুদিন থেকেই 'পুলিশকে জনগণের বন্ধু' করার একটি মিঠা কথা শোনানো হয়। এটি শুনতে মধুর, কিন্তু বাস্তবটা বড় কঠিন। যারা শোনান আর যারা শোনেন, উভয়েই জানেন আসলে পুলিশকে মানুষ বানানোর রাস্তায় কত খানাখন্দর!

সম্ভাবনার আলো

ঘটনাচক্রে এবার একটা সুযোগ এসেছে পুলিশকে শুদ্ধ করার। এটি সরকারের উচ্চ অগ্রাধিকার। আবার পুলিশের ভেতরেও কারো কারো তাগিদ এসেছে মানুষ হওয়ার। এটি ভালো লক্ষণ। ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুটি ঘটনা তাই উদাহরণ হিসেবে টানা হয়েছে। বাকিটা পদক্ষেপের বিষয়। দুষ্কর্মের অনেক কাফফারা গুনতে হয়েছে পুলিশকে। ঘরে স্ত্রী-সন্তান-স্বজনদের কাছেও চিহ্নিত হতে হয়েছে মন্দ প্রজাতি হিসেবে। পক্ষান্তরে সেই সময়ে ছাত্র-জনতার পালস বুঝেছে সেনাবাহিনী। আর এর সুবাদে তারা হয়ে গেছে জনগণের বন্ধু। পুলিশকে সেই বাস্তবতা ও ঘটনাবলি নতুন করে ভাবনায় নিতে হবে।