ফরিদপুরের মধুখালীর পশ্চিম গোন্দারদিয়া সরদারপাড়ায় চন্দনা-বারাশিয়া নদীর পূর্ব তীর থেকে ২০২২ সালের ২৬ ডিসেম্বর একটি বস্তা উদ্ধার করে থানা-পুলিশ। বস্তাটি খুলতেই বেরিয়ে আসে মাথার খুলি, কয়েকটি দাঁত ও হাড়। নিহতের পরিচয় ও হত্যার কারণ জানা ছিল না। মধুখালী থানা-পুলিশ একটি হত্যা মামলা করে। তবে নিহত অজ্ঞাতনামা থাকায় তদন্তে অগ্রগতি হচ্ছিল না।
তদন্তভার পায় পিবিআই
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মামলার তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে যায়। পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন। ওই এলাকার নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা খুঁজতে গিয়ে সামনে আসে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি)।
নদী থেকে হাড়গোড় উদ্ধারের মাস ছয়েক আগে ইতি বেগম নামের এক নারী মধুখালী থানায় জিডি করেছিলেন। তাতে বলা হয়েছিল, তাঁর ১১ বছরের ছেলে মুরসালিন শেখকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তদন্তকারীরা জিডির সূত্র ধরে ইতি বেগমের নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠান।
ডিএনএ পরীক্ষায় পরিচয় মেলে
২০২৩ সালের জুলাইয়ে ডিএনএ প্রতিবেদন পায় পিবিআই। প্রতিবেদনে নিশ্চিত হয়, উদ্ধার হওয়া কঙ্কালটি মুরসালিন শেখের। এই সময়ের মধ্যে মুরসালিনের সৎবাবা মিজানুর রহমান হঠাৎ এলাকা ছেড়ে চলে যান। তিনি স্বজনদের জানান, কাজের সন্ধানে বাইরে যাচ্ছেন। তবে তদন্তকারীদের কাছে বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হয়।
পিবিআই জানায়, প্রত্যক্ষ কোনো সাক্ষী বা দৃশ্যমান আলামত না থাকলেও পরিস্থিতিগত প্রমাণ, ডিএনএ রিপোর্ট ও আসামির স্বীকারোক্তির সমন্বয়ে হত্যার রহস্য উন্মোচন করা হয়েছে। শিশুটির পরিচয় মুছে ফেলতে চেয়েছিলেন হত্যাকারী, কিন্তু নদীর তীরে পড়ে থাকা হাড় থেকে শেষ পর্যন্ত সেই গোপন সত্য সামনে চলে আসে।
ফোনালাপের সূত্র ধরে গ্রেপ্তার
তদন্তকারীরা ভিন্ন কৌশল নেন। পিবিআই কর্মকর্তারা মিজানুরের মা-বাবাকে জানান, তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী মিজানুরই হত্যাকাণ্ডে জড়িত। এই খবর মিজানুরের কাছে পৌঁছে যাবে—এই কৌশল কাজে দেয়। মিজানুরের বাবা এক আত্মীয়ের মুঠোফোন থেকে ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তদন্তকারীদের বলা কথাগুলো জানান। দুজনের কথোপকথনের রেকর্ড পিবিআইয়ের হাতে আসে। পিবিআই বলছে, এরপর মিজানুরের জড়িত থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়।
মিজানুরকে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে মাগুরা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন। কিন্তু তদন্তকারীরা একের পর এক তথ্যপ্রমাণ সামনে আনলে মিজানুর ভেঙে পড়েন এবং দোষ স্বীকার করেন। পরে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
হত্যার বিবরণ
পিবিআইয়ের তদন্তে জানা গেছে, মুরসালিন ইতি বেগমের প্রথম পক্ষের সন্তান। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ছেলেকে নিয়ে আলাদা থাকতেন ইতি। পরে স্থানীয় শ্রমজীবী মিজানুর রহমানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং ২০১৯ সালে বিয়ে করেন। এই সংসারে ইতি বেগমের আরেকটি সন্তান হয়। সংসারে অভাব-অনটন ও পারিবারিক কলহ ছিল। মিজানুরের প্রথম স্ত্রী দ্বিতীয় বিয়ে মেনে নিতে পারেননি। ২০২২ সালের জুনে পারিবারিক কলহের জেরে ইতি ছোট সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় চলে যান। মুরসালিনকে রেখে আসেন মধুখালীতে নানির কাছে।
মিজানুর জবানবন্দিতে জানান, ২০২২ সালের ২৫ জুন সকালে মধুখালীর চেয়ারম্যান ঘাটের কাছে মরিচখেতে কাজ করার সময় মুরসালিনের সঙ্গে দেখা হয়। মুরসালিনকে একটি জমির পাশে নিয়ে গিয়ে ইতির খোঁজ জানতে চান। মুরসালিন জানায়, মায়ের বিষয়ে সে কিছুই জানে না। এ নিয়ে দুজনের রাগারাগি হয়। একপর্যায়ে মুরসালিনের কানে জোরে আঘাত করেন মিজানুর। শিশুটি মাটিতে পড়ে যায় এবং কান দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে। ঘটনাস্থলেই মারা যায় মুরসালিন।
মরদেহ গুমের চেষ্টা
হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন মিজানুর। মুরসালিনের মরদেহ শুরুতে একটি ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলেন তিনি। স্বাভাবিকভাবে কাজ করেন সারা দিন। রাতে ফিরে এসে মরদেহ একটি প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে নিয়ে যান নদীর দিকে। লাশ শনাক্ত করা কঠিন করতে শিশুটির পরনের কাপড় খুলে আলাদা করে ফেলেন। এরপর কয়েক কিলোমিটার হেঁটে গিয়ে বস্তাবন্দী মরদেহটি নদীতে ফেলে দেন।
পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, মিজানুরের ধারণা ছিল, নদীর স্রোতে ভেসে গেলে হয়তো কোনো দিন মুরসালিনের পরিচয় জানা যাবে না। তবে মরদেহটি ভেসে যায়নি; পঁচে বেশির ভাগ অংশ নষ্ট হয়ে যায়, অবশিষ্ট থাকে হাড়গোড়।
পিবিআইয়ের প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল বলেন, “প্রত্যক্ষ কোনো সাক্ষী কিংবা দৃশ্যমান আলামত না থাকলেও পরিস্থিতিগত প্রমাণ, ডিএনএ রিপোর্ট আর আসামির স্বীকারোক্তির সমন্বয়ে হত্যার রহস্য উন্মোচন করা হয়েছে। শিশুটির পরিচয় মুছে ফেলতে চেয়েছিলেন হত্যাকারী। কিন্তু নদীর তীরে পড়ে থাকা হাড় থেকে শেষ পর্যন্ত সেই গোপন সত্য সামনে চলে আসে।”



