২০২০ সালের ৯ নভেম্বর ভোরে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের গৌরীপুরের গঙ্গাশ্রম এলাকার একটি খালে স্যুটকেসে ভরা তরুণীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। স্যুটকেসের ভেতরে একটি বড় বস্তা ছিল, যাতে মরদেহের সঙ্গে পাঁচটি ইট রাখা ছিল। শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকায় প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়, পরিকল্পিত হত্যার পর মরদেহ গুম করার জন্যই স্যুটকেসটি খালে ফেলা হয়েছে।
প্রেসক্রিপশনের সন্ধান
তদন্তের শুরুতে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। পরে মামলাটি পিবিআইয়ের কাছে যায়। তদন্তের সময় স্যুটকেসের ভেতরে কয়েকটি পুরোনো প্রেসক্রিপশন পাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ না মনে হলেও পরে তা তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। প্রেসক্রিপশনের তথ্য যাচাই করে পিবিআই ময়মনসিংহ শহরের একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাটে পৌঁছায়। সেখানেই নিহত তরুণীর পরিচয় ও হত্যার কারণ মেলে।
নিহত তরুণীর পরিচয়
পিবিআই জানায়, নিহত তরুণীর নাম সাবিনা, বয়স ২১ বছর। বাড়ি ময়মনসিংহে। তিনি ওই ফ্ল্যাটে গৃহকর্মীর কাজ করতেন। ফ্ল্যাটটির বাসিন্দা ছিলেন আবুল খায়ের জাকির হোসেন ও তাঁর স্ত্রী রিফাত জেসমিন জেসি। কয়েক বছর ধরে সাবিনা ওই বাসায় কাজ করতেন।
হত্যার ঘটনা
তদন্তে উঠে আসে, ২০২০ সালের ৮ নভেম্বর সকালে অসুস্থতার কারণে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠায় গৃহকর্ত্রী রিফাত সাবিনাকে মারধর করেন। একপর্যায়ে মাথা দেয়ালে ঠুকে দিলে সাবিনার মৃত্যু হয়। পরে জাকির বাসায় ফিরে স্ত্রীর কাছ থেকে ঘটনা শোনেন এবং দুজনে মিলে মরদেহ গুম করার পরিকল্পনা করেন।
মরদেহ গুমের চেষ্টা
মরদেহ প্রথমে বস্তায় ভরে পাঁচটি ইট দেওয়া হয় যাতে পানিতে ডুবে থাকে। পরে বস্তাটি একটি পুরোনো স্যুটকেসে রেখে রাতে গাড়িতে করে খালে ফেলে দেওয়া হয়। সিসিটিভি ফুটেজ ও মুঠোফোনের অবস্থানের তথ্যে এই ঘটনা নিশ্চিত হয়।
গ্রেপ্তার ও স্বীকারোক্তি
পর্যাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি জাকির-রিফাত দম্পতিকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যার কথা স্বীকার করে। পিবিআইয়ের প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল বলেন, 'গৃহকর্মী সাবিনার মরদেহ গুম করতে চেয়েছিলেন খুনিরা। এ জন্য বস্তায় মরদেহ ভরে ইট রাখা হয়েছিল, যাতে বস্তাটি পানিতে ডুবে থাকে। কিন্তু মরদেহ ভরা স্যুটকেসে কয়েকটি পুরোনো প্রেসক্রিপশন রয়ে গিয়েছিল। প্রেসক্রিপশন ও প্রযুক্তিগত আলামত খুনিদের শনাক্তে পুলিশকে সহায়তা করেছে।'
পরিবারের ধারণা
এদিকে সাবিনার পরিবার জানত না যে তিনি মারা গেছেন। জাকির-রিফাত দম্পতি ফোন করে বলতেন, সাবিনা ভালো আছে এবং কাজ করছে। এমনকি নিয়মিত টাকাও পাঠাতেন। পরে পিবিআই সাবিনার পরিবারকে জানায় যে তিনি খুন হয়েছেন এবং মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।



