কুমিল্লা নগরের কাটাবিল এলাকায় মাদকবিরোধী মানববন্ধন কর্মসূচিতে হামলা ও মাদক কারবারিদের হাতে গুলিবিদ্ধ ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইথান আহমেদের মায়ের সঙ্গে দেখা করেছেন কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাত ৯টার দিকে নগরীর কাটাবিল এলাকায় তাদের বাড়িতে যান তিনি।
এমপির কঠোর বক্তব্য
এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত থাকা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ারকে উদ্দেশ করে এমপি বলেন, 'আমরা সবাই তাদের (মাদক কারবারিদের) কাছে স্যারেন্ডার করে চলে যাই। আর না হয় কিছু একটা করেন। না হয় চলেন মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়ে ক্ষমতা ছাইড়া দিই। মাদক কারবারি থাকবে, একজন স্কুলছাত্র স্কুলে যেতে পারবে না, তারপর আপনি ওসি থাকবেন, আমি এমপি থাকবো, এটা ঠিক না। কী জবাব দেবেন এই পরিবারের কাছে।'
তিনি আরও বলেন, 'মাদক কারবারিদের ধরতে প্রয়োজনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্র সচিবের সাথে কথা বলা হবে। তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। ইতোমধ্যে আমি ডিআইজি এবং কুমিল্লার এসপি সাহেবের সাথে কথা বলেছি। আমি রাতের মধ্যেই ফলাফল দেখতে চাই।'
আহত শিক্ষার্থীর মায়ের বক্তব্য
মনিরুল হক চৌধুরী আহত ইথান আহমেদের মা সোনিয়া আক্তারের সাথে কথা বলেন। তার সাথে কে কে আছে তার খোঁজখবর নেন এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে যোগাযোগ করে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন।
এ সময় আহত ইথান আহমেদের মা বলেন, 'অপু এবং সাব্বির দুই গ্রুপের মধ্যে কয়েকদিন ধরেই মারামারি চলছিল। আজকে আমি আমার ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়েছিলাম। টিফিন দেওয়ার পর বাসায় আসার সময় আমার ছেলের পিঠে গুলি লাগে। আমার একটি মাত্র ছেলে। আমার ছেলের কিছু হলে আমি কী নিয়ে বাঁচবো।'
ঘটনার বিবরণ
এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুরে নগরীর কাটাবিল এলাকায় মাদক কারবারিদের দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় ৬ষ্ঠ শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়। তাকে উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে সে। গুলিবিদ্ধ ইথান আহমেদ কাটাবিল এলাকার বাসিন্দা মো. ইউনুস মিয়ার ছেলে। এ ঘটনায় আরও চার জন আহত হন।
কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, 'ওই শিক্ষার্থীর পিঠে বিদ্ধ হওয়া গুলিটি ফুসফুসেও আঘাত করে। হাসপাতালে তাৎক্ষণিক আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র) ফাঁকা না থাকায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বেলা আড়াইটার দিকে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।'
পটভূমি ও পরিস্থিতি
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কাটাবিল এলাকাটি মাদকপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। এই এলাকায় মাদকের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। বুধবার রাত থেকে স্থানীয় দুটি পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। রাতে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার রাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে এলাকার সচেতন বাসিন্দাদের ব্যানারে একটি পক্ষ মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। সেই মানববন্ধন থেকে এলাকায় মাদক ব্যবসা বন্ধের দাবি এবং আগের রাতের ঘটনার প্রতিবাদ জানানো হয়। তবে কর্মসূচির শেষে একদল অস্ত্রধারী সেখানে হামলা চালায়। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।
গুলির শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছোটাছুটি শুরু করে। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এমন সময় বিদ্যালয়ে টিফিন বিরতিতে খাবার কিনতে বের হওয়া ওই শিক্ষার্থীর পিঠে গুলি লাগে। এ ছাড়া উভয় পক্ষের অন্তত চার জন আহত হন। অন্য আহত ব্যক্তিদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের কার্যক্রম
কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. সাইফুল মালিক বলেন, 'ঘটনাস্থলে বর্তমানে পুলিশের একাধিক টিমের পাশাপাশি ডিবি পুলিশও কাজ করছে। ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।'



