৪৩তম বিসিএসের নন-ক্যাডার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আইনি নির্দেশনা দিয়ে রায় ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকার ও বিচারপতি উর্মি রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেন। রায়ে বলা হয়, নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হয়নি, তাই আগামী ৬০ দিনের মধ্যে পুনরায় স্বচ্ছভাবে মেধা তালিকা প্রকাশ করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা
রিটকারীদের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব বলেন, "৪৩তম বিসিএস নন-ক্যাডার যে নিয়োগ হয়েছে, এই নিয়োগ প্রক্রিয়াটা আইন অনুযায়ী হয়নি, এটা কোর্ট বলেছেন। নিয়োগ স্বচ্ছভাবে হয়নি। আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে এই নিয়োগ প্রক্রিয়াটা সম্পন্ন হয়েছে। তাই কোর্ট এখানে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে পুনরায় এই নন-ক্যাডার নিয়োগ প্রক্রিয়াটা স্বচ্ছভাবে, মেধা তালিকা প্রকাশ করার।"
পূর্বের আদেশ ও রিটের প্রেক্ষাপট
এর আগে ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর ৪৩তম বিসিএসের নন-ক্যাডারদের ৮ হাজার ৫০১টি পদ সংরক্ষণে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। ৪৩তম বিসিএস প্রার্থীদের ৭৭৩ জনের দায়ের করা এক রিট আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. হামিদুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত তৎকালীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি ৪৩তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ও ক্যাডারপদে সুপারিশ পায়নি এমন ৫০০ জন চাকরিপ্রার্থী রিটটি দায়ের করেন। পরবর্তী সময়ে আরও ২৭৩ জন আবেদনকারী হিসেবে যুক্ত হন। রিটে পিএসসি চেয়ারম্যান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়।
রিটে উত্থাপিত অভিযোগ
রিট আবেদনে বলা হয়, ৪৩তম বিসিএস পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি ২০২০ সালের ৩০ নভেম্বর প্রকাশিত হয়। প্রিলিমিনারি পরীক্ষার পরে ওই বিসিএসে সর্বমোট ৯ হাজার ৮৪১ জন পরীক্ষার্থী লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পিএসসির ২০২৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর নন ক্যাডার পদে চাকরি করতে ইচ্ছুক এমন প্রার্থীদের অনলাইনে পছন্দক্রম আহ্বান করে। পরবর্তী সময়ে ওই বছরের ২৬ ডিসেম্বর বিভিন্ন ক্যাডার সার্ভিস পদে ২ হাজার ১৬৩ জনকে এবং একইসঙ্গে ৬৪২ জনকে বিভিন্ন নন ক্যাডার পদে সুপারিশ করা হয়। অথচ নন ক্যাডার মেধা তালিকা প্রকাশ করা হয়নি, যা ‘নন ক্যাডার পদে নিয়োগ (বিশেষ) বিধিমালা ২০১০, সংশোধিত বিধিমালা ২০১৪’ এর পরিপন্থি।
বিধিমালা লঙ্ঘন ও পদ প্রত্যাহার
৪৩তম বিসিএস সার্কুলারে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কিন্তু পদ স্বল্পতার কারণে বঞ্চিত নন ক্যাডার প্রার্থীদের নন ক্যাডার পদে নিয়োগ (বিশেষ) বিধিমালা ২০১০, সংশোধিত ‘বিধিমালা ২০১৪’ অনুযায়ী সুপারিশ করা হবে। ওই বিধি অনুযায়ী পিএসসি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে আসা পদগুলিকে সংরক্ষণ করবেন এবং পরবর্তী বিসিএস’র চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার আগ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিসিএস’র নন ক্যাডার প্রার্থীদের ধাপে ধাপে সুপারিশ করবেন। কিন্তু পিএসসি নন ক্যাডারদের মেধা তালিকা প্রকাশ না করেই সম্পূর্ণ অন্যায় এবং বিধি বহির্ভূতভাবে ৬৪২ জনকে বিভিন্ন নন ক্যাডার পদে সুপারিশ করেছে; যা আইনের দৃষ্টিতে অন্যায় এবং বাতিল করা আবশ্যক।
মামলা চলমান থাকা অবস্থায় ২০২৫ সালের মে মাসে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পাঠানো নন ক্যাডার পদগুলোর সমন্বয় করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৮ হাজার ৫০১টি পদে ৪৩তম বিসিএস’র নন ক্যাডার প্রার্থীদের মধ্য থেকে সুপারিশ করার জন্য বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে নির্দেশ দেয়। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৮ হাজার ৫০১টি পদের মধ্য থেকে অনেকগুলো পদ প্রত্যাহার করে পরবর্তী ৪৪তম বিসিএস নন ক্যাডার প্রার্থীদের মধ্য থেকে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে।
আইনজীবীর বক্তব্য
রিটকারীদের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব বলেন, "নন ক্যাডার প্রার্থীদের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশ না করা এবং ফলাফল প্রকাশের আগেই নন ক্যাডার প্রার্থীদের পছন্দক্রম আহ্বান করা সংশ্লিষ্ট নন ক্যাডার নিয়োগ বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এটি অনাকাঙ্ক্ষিত এবং দুঃখজনক। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে মেধাবী হাজার হাজার উত্তীর্ণ চাকরি প্রার্থীদের বিষয়টি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করা পিএসসির সাংবিধানিক দায়িত্ব। ইতোমধ্যে অনেক চাকরি প্রার্থীর বয়সসীমা অতিক্রম হওয়ায় তারা অন্য কোনও সরকারি চাকরিতে আবেদনও করতে পারবেন না। ফলে তারা চরম হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছেন। সম্প্রতি ৪৩তম বিসিএস নন ক্যাডার প্রার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত পদ প্রত্যাহার করে ৪৪তম বিসিএস’র নন ক্যাডার প্রার্থীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি।"



