শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার আব্বাস আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলী আসাদ মিয়াকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে। প্রধান শিক্ষক ছুটি না দেওয়ায় গত বৃহস্পতিবার বিদ্যালয়ের অফিসকক্ষে এ ঘটনা ঘটে। মারধরের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।
অভিযোগ ও তদন্ত
এ ঘটনায় ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে থানায় ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুবকর সিদ্দিকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন প্রধান শিক্ষক আলী আসাদ মিয়া। পরে ইউএনওর পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার আব্বাস আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০২৪ সালের মে মাসে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন আলী আসাদ মিয়া। তার আগে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বিদ্যালয়ে যোগ দেন সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। এর মধ্যে সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনকে পাশের ছুরিরচর বোর্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছয় মাসের জন্য প্রেষণে পাঠানো হয়েছিল। পরে চলতি বছরের জানুয়ারিতে আবার তিনি আব্বাস আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফিরে আসেন।
ঘটনার বিবরণ
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে ঢুকে ছুটির আবেদন করেন দেলোয়ার হোসেন। প্রধান শিক্ষক তাঁকে ছুটি দিতে আপত্তি জানালে দুজনের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে দেলোয়ার হোসেন প্রধান শিক্ষককে মারধর করেন। পরে অন্য শিক্ষকেরা পরিস্থিতি শান্ত করেন।
ছড়িয়ে পড়া ১ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, প্রধান শিক্ষক আরও ছয় শিক্ষক ও অফিস সহকারীকে নিয়ে নিজের কক্ষে কাজ করছিলেন। তখন সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন নিজের শিশুসন্তান নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে একটি চেয়ারে বসেন। কিছুক্ষণ পর প্রধান শিক্ষক তাঁর চেয়ার থেকে উঠে জানালার কাছে দাঁড়ান। তখন দেলোয়ার হোসেন দাঁড়িয়ে তাঁকে মারধর করেন। এ সময় অন্য শিক্ষকেরা তাঁদের নিবৃত্ত করেন। এরপর প্রধান শিক্ষক কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। তখন দেলোয়ার হোসেন কক্ষের চেয়ার ও কাগজপত্র ছুড়ে ফেলেন।
প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য
জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক আলী আসাদ মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই শিক্ষক নানা অজুহাতে স্কুল ফাঁকি দিতেন। বিভিন্ন ধরনের অশালীন আচরণ করতেন। যার কারণে তাঁকে ছয় মাসের জন্য অন্য একটি স্কুলে প্রেষণে রাখা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার সে ছুটি চেয়েছিল। কিন্তু ওই দিন বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে এটিও স্যারের (থানার সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা) মিটিং করার কথা ছিল। তাই তাঁকে ছুটি দেওয়া হবে না বলেছিলাম। তাতেই ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি আমাকে মারধর করেন।’
সহকারী শিক্ষকের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক আমার সংসার ভেঙে তছনছ করে দিয়েছেন। তাঁর কারণে আমার স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়েছে। শিশুসন্তানদের নিয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। আমার ৫ বছর বয়সী ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়লে তার চিকিৎসার জন্য ছুটি চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি ছুটি দিচ্ছিলেন না। তখন মাথা ঠিক রাখতে পারিনি। তাই তাঁর সঙ্গে এমন আচরণ করেছি।’
প্রশাসনের পদক্ষেপ
উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আল মুজাহিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই শিক্ষকের মধ্যে ঝামেলা হয়েছে। প্রধান শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ পেয়ে সরেজমিন তদন্ত করেছি। এখন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।’
ভেদরগঞ্জের ইউএনও আবুবকর সিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষককে মারধরের ঘটনায় একটি অভিযোগ তিনি পেয়েছেন। তাঁরা তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে মহাপরিচালকের কাছে সুপারিশ করা হবে।



