স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই যোদ্ধাদের মতো গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারকেও ভাতা দেওয়া হবে। আগামী অর্থবছরের বাজেটেই এ জন্য বরাদ্দ রাখা হবে। শুক্রবার (২৬ এপ্রিল) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে ‘প্রতিকার ও পুনর্বাসনের অধিকার’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
গুমের শিকার পরিবারের জন্য বাজেট বরাদ্দ
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বারবার বলেছি, যদি মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা দেওয়া হয়, জুলাই যোদ্ধাদের ভাতা দেওয়া হয়, তাহলে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলোকে কেন ভাতা দেওয়া হবে না? অবশ্যই ভাতা দিতে হবে এবং সেটা আমরা এই বাজেটেই প্রভিশন রাখার ব্যবস্থা করব।’ তিনি গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের ক্ষতি কখনো পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করেন। ‘ক্ষতিগুলো পূরণ করা যাবে না। পাশে তো দাঁড়াতে পারি, সাহস দিতে পারি। ভবিষ্যৎ নির্মাণের ব্যবস্থা রাষ্ট্র করতে পারে,’ যোগ করেন তিনি।
গুম মানবতাবিরোধী অপরাধ
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘এটা মানবতাবিরোধী অপরাধ। প্রকাশ্যে এদের বিচার হওয়া উচিত, শাস্তি হওয়া উচিত।’ তিনি জিয়া (অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান) ও বেনজীর (পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ) ধরা পড়ার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, অহংকার, দাম্ভিকতা ছিল; দেখুন, আল্লাহ ঠিক হাজির করছেন আদালতের সামনে, জনগণের সামনে। বিশ্বাস করি, একে একে প্রত্যেকে ধরা পড়বে, প্রত্যেকের বিচার হবে।’
রাজনীতির ঊর্ধ্বে গুম
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী গুম ও নির্যাতনের ঘটনাকে রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে না দেখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘গুম হওয়া, অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হওয়া—এগুলো নিয়ে রাজনীতি করতে চাই না। এ ব্যাপারে আমরা সবাই এক। আমরা বিচার চাই। তাঁদের (ভুক্তভোগী) পাশে দাঁড়াতে চাই। তাঁদের স্বীকৃতি চাই। আইনের যে শক্তি, সেই শক্তি তাঁদের হাতে তুলে দিতে চাই।’
ভুক্তভোগীর কণ্ঠ
সংলাপে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর গুম হওয়া চালক কাওসার হোসেনের মেয়ে লামিয়া আক্তার মীম। তিনি বলেন, ‘আমার বাবাকে এবং আদনান চাচ্চুকে রাতে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এক যুগেরও বেশি হয়ে গেছে, আমি আমার বাবাকে দেখিনি। আমার বয়স ছিল মাত্র তিন বছর।’ বাবার সঙ্গে তোলা একটি ছবি ছাড়া তার আর কোনো স্মৃতি নেই বলে জানান তিনি।
২০২৫ সালের ৫ জুন ‘আয়নাঘর’ পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে লামিয়া বলেন, ‘আয়নাঘরের একেকটা সেল, সেটা বলে বোঝানো যাবে না। ওই সেলগুলোর নামই ছিল কবর সেল, যেখানে একজন সুস্থ মানুষ পাঁচ মিনিট থাকলে অসুস্থ হয়ে যাবে। ওই সেলে আমার বাবা, আমার চাচ্চুরা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর থেকেছেন।’ তিনি বিচার দাবি করেন।
ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে দেব না
ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম, যিনি দীর্ঘদিন গুম ছিলেন, বলেন, ‘১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনামলে গুমের ভুক্তভোগীরা নিজ দেশেই উদ্বাস্তু ছিল।’ তিনি গুমের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারগুলোর তিনটি দাবি তুলে ধরেন: জবাবদিহি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, পুনর্বাসন বা ক্ষতিপূরণ, এবং ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা। তিনি বলেন, ‘যাদের পরিবারের প্রিয় মানুষটি ফিরে আসেনি, তাদের ক্ষতিপূরণ কেউ দিতে পারবে না। কিন্তু অন্তত তারা যেন অর্থনৈতিকভাবে আরেকজনের কাছে মুখাপেক্ষী না হয়—এতটুকু দায়িত্ব কি সরকার নিতে পারে না?’
মীর আহমাদ বিন কাসেম জুলাই জাদুঘরকে ফ্যাসিবাদ চেনার পাঠশালা হিসেবে লালনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘এই বাংলার মাটিতে আমরা আর কোনো দিন কোনো ফ্যাসিবাদের কার্যক্রম ফিরে আসতে দেব না। ভিকটিম পরিবারগুলোকে সরকার নিজের করে নিক, তাদের আশ্রয় দিক।’
ডিএনএ পরীক্ষার প্রস্তাব
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, বুড়িগঙ্গা নদী দিয়ে ভেসে যাওয়া অনেক গুলিবিদ্ধ লাশ মুন্সিগঞ্জে উদ্ধার করা হয়েছিল। ওই সময় যাঁরা গুম হয়েছেন, সেগুলো তাঁদের লাশ হতে পারে বলে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তিনি উদ্ধার করা লাশের ডিএনএ নমুনা এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে মেলানোর প্রস্তাব দেন।
জাতিসংঘ ঘোষিত ‘নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সমর্থনে আন্তর্জাতিক দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে এই সংলাপের আয়োজন করে হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (এইচআরডিসি) ও মায়ের ডাক। সংলাপে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম প্রমুখ বক্তব্য দেন।



