যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ শহরে বাংলাদেশের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ ও তার কয়েকজন সহযোগী সাবেক একজন ছাত্রলীগ নেতাকে মারধর করেছেন বলে দেশটির পুলিশের কাছে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্সের এক নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। হাসনাত আবদুল্লাহর কাছেও ঘটনার বিষয়ে পুলিশ জানতে চেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ঘটনার বিবরণ
স্থানীয় সময় শুক্রবার বিকেলে (১৯ জুন) কেমব্রিজ শহরে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশের কাছে অভিযোগকারী জুবায়ের আহমেদ বলেছেন, হাসনাত আবদুল্লাহ ও তার সহযোগীরা তার পথ আটকে মারধর করেছেন। তার তলপেটে ছুরিকাঘাতের চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে সেখানে হালকা জখম হয়েছে।
জুবায়ের আহমেদ জানিয়েছেন, তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণাগারে কর্মরত এবং ফুড ডেলিভারির কাজও করেন। তিনি একসময় সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ঘটনার দিন তিনি মোটরসাইকেলে করে খাবার সরবরাহের কাজে বের হয়েছিলেন। একপর্যায়ে একটি সাদা রঙের গাড়ি ট্রাফিক নিয়ম অনুযায়ী তাকে অগ্রাধিকার না দিয়ে বেপরোয়াভাবে চলে যায়। এর প্রতিবাদ জানাতে তিনি গাড়িটিকে অনুসরণ করতে শুরু করেন, তখন তিনি জানতেন না যে গাড়িটিতে হাসনাত আবদুল্লাহ অবস্থান করছিলেন।
হামলার বর্ণনা
জুবায়ের বলেন, কিছু দূর যাওয়ার পর গাড়িটি রাস্তার মধ্যে থামে। পরে আরেকটি গাড়িও সেখানে এসে দাঁড়ায়। এ সময় এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্সের নেতা জাকির চৌধুরী তার মোটরসাইকেলের গতি রোধ করেন। এরপর হাসনাত আবদুল্লাহকে বহনকারী গাড়ি থেকে কয়েকজন ব্যক্তি নেমে এসে তাকে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি মারেন। তিনি হেল্প হেল্প বলে চিৎকার করেন এবং আত্মরক্ষার চেষ্টা করেন। আশপাশের লোকজন চিৎকার শুনে এগিয়ে এলে হামলাকারীরা দ্রুত গাড়িতে উঠে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। জুবায়ের আরও দাবি করেন, হামলাকারীদের একজনের হাতে ছুরি ছিল এবং তাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করা হয়, যাতে তার তলপেটের বাঁ পাশে হালকা আঘাত লাগে।
পুলিশি তদন্ত
ঘটনার পর রক্তমাখা পোশাকসহ তিনি পুলিশকে জানান। জুবায়েরের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকা একজন শ্বেতাঙ্গ নারী প্রত্যক্ষদর্শী পুলিশে ফোন করেন এবং তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে পুলিশ তার বক্তব্য নেয় এবং অভিযোগটি আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করে। এরপর কেমব্রিজে এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্সের নেতা জাকির চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে পুলিশ। পরে বক্তব্য নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পুলিশ হাসনাত আবদুল্লাহর সঙ্গেও যোগাযোগ করে ঘটনার বিষয়ে তথ্য ও বক্তব্য চেয়েছে বলে তার আইনজীবী জানান।
এনসিপির বক্তব্য
এ ঘটনায় জুবায়েরের ওপর হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্সের এক নেতা। সংগঠনটি শনিবার (২০ জুন) এক বিবৃতিতে বলেছে, যুক্তরাজ্যে আওয়ামী লীগ ও পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের সমর্থকেরা হাসনাত আবদুল্লাহ এবং তার সফরসঙ্গীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অপপ্রচার ও হয়রানির পর এবার নতুন নাটক শুরু করেছে। তারা হাসনাত আবদুল্লাহ, এহতেশাম হক, জাকির চৌধুরী, শাহীন আলমসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে 'বেধড়ক পেটানোর' অভিযোগ এনে থানায় মামলা করেছে, যা দিয়ে যুক্তরাজ্য পুলিশের মূল্যবান সময় নষ্ট করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, জননিরাপত্তা ও যুক্তরাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে যুক্তরাজ্যের একটি বিশেষায়িত সংস্থা তদন্ত শুরু করেছে।
জাকির চৌধুরীর বক্তব্য
জাকির চৌধুরী বলেন, অভিযোগকারী জুবায়ের আহমেদকে তিনি আগে থেকেই চিনতেন এবং জুবায়ের প্রায় দুই বছর তার রেস্তোরাঁয় কাজ করেছেন। ঘটনার দিন কেমব্রিজে হাসনাত আবদুল্লাহকে দেখতে পেয়ে জুবায়ের মোটরসাইকেলে করে তাদের গাড়িকে প্রায় ৩০ মিনিট ধরে অনুসরণ করেন। একপর্যায়ে তারা তাকে থামিয়ে জানতে চান কেন তিনি তাদের অনুসরণ করছেন। জাকির দাবি করেন, ওই সময় জুবায়ের তার হেলমেট খুলে হাসনাত আবদুল্লাহর দিকে এগিয়ে যান এবং আক্রমণাত্মক আচরণ করেন, তাই তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করা হয়। তবে তাকে মারধর বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হামলা চালানো হয়নি বলে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, 'আমরা তাকে আক্রমণ করিনি; তাকে শান্ত করার এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছি।' জাকির আরও দাবি করেন, যুক্তরাজ্য পুলিশ তদন্ত করে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ না পাওয়ায় তদন্ত বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি জানান, হাসনাত আবদুল্লাহ ঘটনার বিষয়ে পুলিশের কাছে অনলাইনে একটি বিবৃতি দিয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য
প্রাপ্ত নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যানুযায়ী, এ ঘটনায় একজন শ্বেতাঙ্গ নারীসহ দুজন প্রত্যক্ষদর্শী পুলিশের কাছে বক্তব্য দিয়েছেন। একজনের ভাষ্যমতে, ঘটনাস্থলে প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়, পরে গাড়ি থেকে কয়েকজন ব্যক্তি নেমে জুবায়েরকে ঘিরে ধরেন এবং তাকে ধাক্কাধাক্কি ও টানাহেঁচড়া করা হয়। আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তিনি কাছাকাছি একটি বাসা থেকে উচ্চ স্বরে চিৎকার শুনে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে কয়েকজনকে এক ব্যক্তিকে টানাহেঁচড়া করতে দেখেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ১৯ জুন শুক্রবার বিকেল ৪টা ১৯ মিনিটের কিছু আগে ঘটে। হামলাকারীরা গাড়িতে উঠে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন এবং সাক্ষী গাড়িটির রেজিস্ট্রেশন নম্বরের ছবি তুলতে সক্ষম হন।
প্রেক্ষাপট
অক্সফোর্ড বাংলা সোসাইটি আয়োজিত একটি আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ১৩ জুন যুক্তরাজ্যে যান হাসনাত আবদুল্লাহ এবং এখনো তিনি দেশটিতে অবস্থান করছেন। এ ঘটনার তদন্তে অগ্রগতি জানতে আজ রোববার লন্ডন পুলিশকে মেইল করা হলেও তাদের কাছ থেকে জবাব পাওয়া যায়নি। লন্ডনের বাংলাদেশ হাইকমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি দেখভালের জন্য একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।



