রমনা বোমা হামলার ২৫ বছর: বিস্ফোরক মামলার বিচার এখনও অসমাপ্ত
দুই যুগ অতিক্রম করে পঁচিশ বছর পূর্ণ হলো রমনা বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে নৃশংস বোমা হামলার ঘটনা। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল, বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ মুহুর্মুহু বিস্ফোরণে রূপ নেয় এক শোকাবহ ট্র্যাজেডিতে। ওই হামলায় ১০ জন প্রাণ হারান। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এ ঘটনায় দায়ের করা দুই মামলার মধ্যে বিস্ফোরক আইনের মামলাটির বিচার এখনও শেষ হয়নি। হত্যা মামলার রায় এক দশক আগেই হলেও, বিস্ফোরক মামলাটি চার বছর ধরে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন শুনানির পর্যায়ে আটকে আছে।
হত্যা মামলার রায় ও বিস্ফোরক মামলার স্থবিরতা
রমনা বটমূলের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার রায় হয় হামলার ১৩ বছর পর, ২০১৪ সালে। এতে আটজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে একই ঘটনায় দায়ের করা বিস্ফোরক মামলার বিচারকার্য এখনও শেষ হয়নি। মামলাটি বর্তমানে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন শুনানির পর্যায়ে রয়েছে এবং ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১৫-এ বিচারাধীন।
মামলার নথি সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ২১ মার্চ এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। ওইদিনই আদালত ৩৪২ ধারায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন। পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালের ২৮ জুলাই মামলাটি মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১-এ স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে ২০২৩ সালের ৩ জানুয়ারি এটি মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১৫-এ পাঠানো হয়। এরপর চার বছরের বেশি সময় ধরে মামলাটি একই পর্যায়ে রয়েছে।
বিচারপ্রক্রিয়ায় বিলম্বের কারণ
সর্বশেষ, গত ৩১ মার্চ আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য দিন ধার্য থাকলেও কারাগার থেকে আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়নি। এ কারণে মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১৫-এর বিচারক তাওহীদা আক্তার আগামী ৯ জুলাই পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেন।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগরের পাবলিক প্রসিকিউটর পিপি ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, "হত্যা মামলার রায় ইতোমধ্যে হয়েছে। বিস্ফোরক মামলায় ৮৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ৫৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে এবং মামলাটি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।" তিনি বলেন, পূর্বে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়া এবং কিছু সাক্ষীকে পাওয়া না যাওয়ায় বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছে। তবে আগামী বৈশাখের আগেই এ মামলার অগ্রগতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মাহফুজ হাসান বলেন, "কারাগারে থাকা সাত আসামির বিরুদ্ধে বিভিন্ন জেলায় একাধিক মামলা থাকায় তাদের আদালতে হাজির করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে শুনানি বিলম্বিত হচ্ছে। তবে দ্রুত বিচার শেষ করার চেষ্টা চলছে।"
আসামিপক্ষের বক্তব্য ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন
অপরদিকে, আসামিপক্ষের সিনিয়র আইনজীবী মো. জশিম উদ্দিন বলেন, "কিছু আসামি ১৭-১৮ বছর ধরে কাস্টডিতে রয়েছেন। তাদের নাম প্রথম এজাহারে ছিল না, পরে জবানবন্দির ভিত্তিতে যুক্ত করা হয়েছে। পর্যাপ্ত সাক্ষ্য না থাকলেও তাদের দীর্ঘদিন আটক রাখা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।"
আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী মো. ইদি আমিন বলেন, "মামলাটি দ্রুত শেষ করার জন্য তারা আদালতে বারবার আবেদন করেছেন। কিন্তু নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে আসামিদের হাজির না করায় বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে। অনেক আসামি ইতোমধ্যে ২০ থেকে ২৫ বছর কারাভোগ করেছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।"
আসামিদের তালিকা ও মামলার ইতিহাস
বিস্ফোরক আইনের মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন আরিফ হাসান অরফে সুমন, শাহাদাত উল্লাহ জুয়েল, মাওলানা আবু বকর অরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মাওলানা সাব্বির, মুফতি আঃ হাই, মাওলানা শওকত ওসমান অরফে শেখ ফরিদ, মুফতি শফিকুর রহমানসহ আরও কয়েকজন। তাদের মধ্যে কয়েকজন কারাগারে, কয়েকজন পলাতক এবং দুজন জামিনে রয়েছেন।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৩ জুন ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় ঘটনাস্থলেই ৯ জন নিহত হন, পরে হাসপাতালে মারা যান আরও একজন। ওই ঘটনায় রাজধানীর নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল চন্দ্র রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা দায়ের করেন।
ঘটনার প্রায় আট বছর পর ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন, সম্পূরক অভিযোগপত্র এবং সাক্ষ্যগ্রহণে বিলম্বসহ নানা কারণে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়। ২০০৯ সালে মামলা দুটি বিচারের জন্য আদালতে পাঠানো হলেও বিস্ফোরক মামলাটি এখনও নিষ্পত্তি হয়নি, যা ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।



