কুষ্টিয়ায় পীর হত্যা মামলায় ব্যাপক তদন্ত ও অভিযান শুরু
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর গ্রামে পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীমের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। সোমবার রাত ১০টার দিকে নিহতের বড় ভাই ফজলুর রহমান বাদী হয়ে দৌলতপুর থানায় এই মামলা করেন, যেখানে তাঁর সঙ্গে বাকি দুই ভাইও উপস্থিত ছিলেন। মামলায় ফিলিপনগর গ্রামের বাসিন্দা কাঠমিস্ত্রি রাজীব দফাদারকে প্রধান আসামি করা হয়েছে, পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা ১৮০ থেকে ২০০ জনকে আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার বিবরণ ও হামলার বীভৎসতা
মামলার এজাহারে ফজলুর রহমান উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর ছোট ভাই মো. আবদুর রহমান (৫৭) ফিলিপনগরে নিজ বাড়িতে দরবার শরিফ পরিচালনা করতেন। শনিবার বেলা পৌনে ৩টার দিকে তিনি দরবারে অবস্থান করছিলেন, তখন রাজীব দফাদারসহ অজ্ঞাতনামা ১৮০ থেকে ২০০ জন আসামি একযোগে সংঘবদ্ধ হয়ে হাতে লোহার রড, হাঁসুয়া, দা, ছুরি, কুড়াল, বাঁশের লাঠি ও কাঠের বাটাম নিয়ে দরবার শরিফে অনধিকার প্রবেশ করে। তারা দরজা-জানালা ভাঙচুর করে দ্বিতীয় তলায় প্রবেশ করে জোবায়ের (৩১) নামের একজনকে লোহার রড দিয়ে মারধর করে।
এরপর আসামি রাজীব দফাদার লোহার রড দিয়ে আবদুর রহমানের কোমর বরাবর এবং মাথায় আঘাত করে, যার ফলে তিনি গুরুতর আহত হন। অজ্ঞাতনামা আসামিরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁর মাথার ওপর, ডান চোয়ালের কাছে, ঠোঁটের মধ্যে, থুতনিতে, পিঠের বাঁ পাশে ও ডান পায়ের হাঁটুর পেছনে কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে এবং বাঁশের লাঠি ও কাঠের বাটাম দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়িভাবে মারধর করে। আবদুর রহমানের চিৎকারে দরবারের পরিচারিকা জামিরন দৌড়ে এলে, তাঁকেও হত্যার উদ্দেশ্যে মাথায় কোপ মারতে গেলে তিনি বাঁ হাত দিয়ে ঠেকান, ফলে তাঁর বাঁ হাতের কবজির ওপরের অংশের মাংস কেটে রক্তাক্ত জখম হয়।
সম্পত্তি ক্ষতি ও চুরির অভিযোগ
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, আসামিরা দরবার শরিফ ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে আনুমানিক ২০ লাখ টাকার ক্ষতি সাধন করে। তারা স্টিলের আলমারি ভেঙে ১০ লাখ টাকা এবং ৪ ভরি স্বর্ণালংকার চুরি করে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রধান আসামির অনুপস্থিতি ও রাজনৈতিক সংযোগ
সোমবার দুপুরে ফিলিপনগর গ্রামের দারোগার মোড় বাজারে রাজীব দফাদারের কাঠের দোকানে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় একটি চায়ের দোকানিকে পীরকে টেনে বের করে মারার ভিডিও দেখানো হলে তিনি বলেন, 'এটা রাজীব। শনিবার বিকেল পাঁচটার পর দোকানে এসে সে চলে গেছে। আর আসেনি।' রাজীবের বাড়িতে গিয়ে তাঁর বাবাকে পাওয়া না গেলেও, সেখানে হাজির হন রাজীবের বোনের স্বামী জাহাঙ্গীর আলম, যিনি প্রথম আলোকে জানান যে রাজীবের কাঠের দোকান তিনিই দেখছেন এবং শনিবারের পর থেকে রাজীবের কোথায় আছেন তা তিনি জানেন না।
জাহাঙ্গীর আলম আরও উল্লেখ করেন যে, রাজীব গত সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রচার-প্রচারণা করেছেন এবং এলাকার জামায়াত নেতা খাজা আহম্মেদের সঙ্গে থাকেন। ফিলিপনগর গ্রামের বাসিন্দা ও দৌলতপুর উপজেলা জামায়াতের কর্মপরিষদের সদস্য খাজা আহম্মেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। দৌলতপুর উপজেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিনকে ফোন দিলে তিনি একটি অনুষ্ঠানে আছেন জানিয়ে পরে কথা বলবেন বলে জানান।
জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি সুজা উদ্দীন জোয়ার্দ্দার প্রথম আলোকে বলেন, 'যতটুকু শুনেছি দরবারে এলাকার মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে হামলা করেছে। তারা এলাকার সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারে। জামায়াতের কেউ আছে কি না জানা নেই।'
পুলিশের তদন্ত ও অভিযান
কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ভেড়ামারা সার্কেল) দেলোয়ার হোসেন সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে এই তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, আসামি ও জড়িত ব্যক্তিদের ধরতে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, মামলায় ব্যাপক সংখ্যক অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে এবং তদন্ত দ্রুত এগিয়ে চলছে।
এই হত্যাকাণ্ডের পর দরবারে সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে, এবং স্থানীয় সম্প্রদায় শোক ও আতঙ্কে নিমজ্জিত। পুলিশ আশ্বাস দিয়েছে যে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে।



